কক্সবাজার শহরের পশ্চিম সমিতিপাড়ার সরকারি খাসজমিতে ঝুপড়িতে থাকেন শারীরিক প্রতিবন্ধী পারভীন আক্তার (৫০)। স্বামী মনিরুল আলম আগে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন, এখন তিনি বেকার। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার তাবলেরচরের বসতভিটা সাগরে বিলীন হওয়ার পর কক্সবাজার শহরে আশ্রয় নেন তাঁরা। তারপর তিন দশকের বেশি সময় পার হলেও স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠিকানা হয়নি পারভীন পরিবারের।
গতকাল রোববার দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য নির্মিত বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারিতে নাম ওঠে পারভীন আক্তারের। বিনা মূল্যে পাঁচতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পর তিনি আবেগে ভেসে যান।
পারভীন আক্তার বলেন, ‘এত দিন পলিথিনের বস্তিঘরে থাকতাম। বৃষ্টি হলে ঘুমানো যেত না। ফ্যান ছিল না। দিনে মশামাছির উৎপাত লেগেই থাকত। এখন পাঁচতলা ভবনে থাকব—কল্পনাই করতে পারছি না। আল্লাহ চাইলে ঝুপড়িঘর থেকে ফ্ল্যাটবাড়ির মালিক হওয়া যায়।’
পারভীনের মতোই লটারির মাধ্যমে ফ্ল্যাট পেয়েছেন কুতুবদিয়াপাড়ার জেলে রেজাউল করিমও। তিনি বলেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি পাঁচতলা ভবনে থাকব, একটি ফ্ল্যাটের মালিক হব। লটারিতে নাম ওঠার পর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কিছুদিনের মধ্যে ঝুপড়িঘর থেকে ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠতে পারব।’
রোববার খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭৩০টি পরিবারের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারি অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই হাজারের বেশি জলবায়ু উদ্বাস্তু অংশ নেন। জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সবার উপস্থিতিতে এই লটারি হয়। এতে বাস্তুচ্যুত আরও কয়েক শ পরিবারের স্থায়ী আবাসনের স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি হয়েছে।
কুতুবদিয়ার তাবলেরচরে নিজেদের বসতভিটা ছিল পারভীন আক্তারের পরিবারের। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সেই ভিটা সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা কক্সবাজার শহরে বসতি গড়েন। দীর্ঘ সময় ধরে খাসজমিতে ঝুপড়িতে বসবাস করছিলেন পারভীন ও তাঁর পরিবার।
এবার খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ায় তাঁদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসার কথা জানিয়েছেন পারভীন। তিনি বলেন, বৃষ্টি হলে ঝুপড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন ফ্ল্যাটে নিরাপদভাবে থাকার সুযোগ পাওয়ায় তিনি আনন্দিত।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য চার হাজারের বেশি উদ্বাস্তু পরিবারকে সরিয়ে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাঁকখালী নদীর পূর্ব পাশে খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড (ইসিবি) ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় ১২৮টি পাঁচতলা ভবন ছাড়াও সড়কবাতি, মসজিদ, মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার, সাইক্লোন শেল্টার ও মার্কেট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। নদীপথে যোগাযোগের জন্য একাধিক সেতু ও জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে শুঁটকিমহাল; সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা সরাসরি মাছ এনে শুঁটকি করতে পারবেন।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পুরো প্রকল্পে ৪ হাজার ১২৮ পরিবারের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা হবে।
প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করতে কাজ চলছে। সাধারণ বস্তি বা ঝুপড়িতে বসবাসকারী মানুষকে সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য। এটি শুধু আবাসন প্রকল্প নয়, জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জীবনে স্থায়িত্ব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার একটি মানবিক উদ্যোগ।’
মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভবনের পাশাপাশি ড্রেনেজ, পানি শোধনাগার, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও জেটিসহ বিভিন্ন সুবিধা এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।’
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, শুরু থেকেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় সবার সামনে লটারি করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাঁদের প্রাপ্য অধিকার পান। রোববার ৭৩০ পরিবারের জন্য ভবন ও ফ্ল্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবার এখন নিরাপদ ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প এলাকায় অপরাধ, মাদক, চুরি, ছিনতাই ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে জেলা পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লটারি অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিউর রহমান প্রমুখ।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে ৩২টি করে ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে ১২২টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি ভবনের কাজও শেষ পর্যায়ে। এর আগে ১৯টি ভবনে ৬০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ৭৩০ পরিবারের জন্য ভবন ও ফ্ল্যাট নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোকেও পর্যায়ক্রমে একই প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন করা হবে।