প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর তীব্র সংকট, বিকল যন্ত্রপাতি, অচল এসি এবং নিরাপত্তার চরম ঘাটতির মধ্য দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (কুমেক) ২০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা সংকটাপন্ন রোগীদের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। জানা গেছে, দীর্ঘ চার বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েও এ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
সম্প্রতি আইসিইউ পরিদর্শনে দেখা যায়, একটি বাথরুমের পাশেই রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আইসিইউর প্রবেশপথে কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই এবং জরাজীর্ণ দরজাটি ঠিকমতো বন্ধ হয় না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে অনেক চিকিৎসাকর্মী জুতা পরেই ভেতরে প্রবেশ করছেন, যা সংবেদনশীল রোগীদের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
এছাড়া আইসিইউর তিনটি এসি দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দরজার ত্রুটির কারণে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট রয়েছে এখানে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জরুরি ভিত্তিতে সিরিঞ্জ পাম্প, ইকো সুবিধাসহ ইউএসজি মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন, এবিজি পরীক্ষার রিএজেন্ট এবং দুটি ডায়ালাইসিস ইউনিটের প্রয়োজন। এসব সরঞ্জামের অভাবে মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসিএমওসহ বেশ কিছু যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। গত চার বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এসব যন্ত্র মেরামত বা প্রতিস্থাপনের জন্য একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও কোনো বরাদ্দ বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, দুটি ফ্লোরে পরিচালিত এই ২০ শয্যার আইসিইউতে মানসম্মত সেবার জন্য প্রতি শয্যার বিপরীতে চারজন চিকিৎসক থাকার নিয়ম। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কর্মরত চিকিৎসক মাত্র পাঁচজন। নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। প্রতি শিফটে প্রতিটি শয্যার জন্য অন্তত দুজন নার্স প্রয়োজন হলেও সেই জনবল নেই। এছাড়া আয়া ও সহায়ক কর্মীরও তীব্র সংকট রয়েছে।
নোয়াখালী থেকে আসা রোগীর স্বজন মনোয়ারা বেগম বলেন, "চার দিন ধরে রোগীর তেমন কোনো উন্নতি দেখছি না। শুধু বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে বলা হয়। সবকিছু বাইরে থেকে কিনতে হলেও গরিবের জন্য সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা।"
চৌদ্দগ্রামের পাশাকোট এলাকার বাসিন্দা কালু নামে আরেক রোগীর ভাই বলেন, "এখানে সিনিয়র চিকিৎসকের চরম সংকট রয়েছে। আইসিইউর দরজা সব সময় খোলা থাকে, ভেতরে এসি চললেও ঠান্ডা বাতাস বাইরে চলে যায়।"
আইসিইউ ইনচার্জ ডা. জাহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, "আমি অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক হিসেবে আছি। এখানে চাহিদা অনুযায়ী কিছুই নেই। মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক দিয়ে ২০ শয্যার আইসিইউ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।"
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নিশাত সুলতানা বলেন, "একপ্রকার জোড়াতালি দিয়েই আইসিইউ চালাতে হচ্ছে। গত চার বছর ধরে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের চাহিদার কথা জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি পাঠানো হয়েছে, কিন্তু আশানুরূপ কোনো বরাদ্দ মেলেনি।"
হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াসিন বলেন, "হাসপাতালের কোথায় কোথায় জনবল সংকট রয়েছে, তা চিহ্নিত করার নির্দেশ ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে এই সংকটের কার্যকর সমাধান করা সম্ভব হবে।"