সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েও যথাসময়ে তা পাননি সিলেটের মোগলাবাজার থানার কনস্টেবল মামুনুর রশিদ। যখন তিনি ছুটি পান, ততক্ষণে তার যমজ নবজাতক দুজনেই মৃত্যুবরণ করেছে। এই ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই পুলিশ সদস্য।

গত ৩০ জুন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনারের কাছে এই অভিযোগ জমা দেন মামুনুর রশিদ। তার অভিযোগ, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও ওসি তা নাকচ করে দেন। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রসবকালীন জটিলতায় যমজ সন্তানদের মৃত্যু হয়। এমনকি ছুটি পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে স্বজনরা নবজাতকদের একজনের দাফন সম্পন্ন করেন, ফলে মৃত সন্তানের মুখ দেখার সুযোগও পাননি এই বাবা।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে মামুনুর রশিদের স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ১৬ জুন প্রসববেদনা শুরু করেন। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় পরিবারের সদস্যরা বারবার ফোন করলেও ছুটি না পাওয়ায় মামুনুর পৌঁছাতে পারেননি। সেদিনই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। তবে দ্রুতই মা ও নবজাতকদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। দুপুরেই মেয়ে সন্তানটি মারা যায় এবং পরদিন ভোরে ছেলে সন্তানটির মৃত্যু হয়। এই পুরো সময়ে মামুনুর রশিদ ছুটির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, স্ত্রীর গর্ভকালীন জটিলতার কারণে আগে থেকেই সিলেট ও ঢাকায় চিকিৎসা চলছিল। এপ্রিলের শেষ দিকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঈদুল আজহার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করানোর পরিকল্পনা করেছিলেন মামুনুর। তার দাবি, যথাযথভাবে ছুটির আবেদন জমা দিলেও ওসি মনির হোসেন তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাননি। ছুটির অনুরোধ করতে গেলে ওসি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বলেন, ‘বাড়িতে মা-বাবা নেই? তারা চিকিৎসা করাবে। আপনাকে তো আগেই না করেছি।’ এমনকি তাকে কক্ষ থেকে বের করার জন্য অন্য সদস্য ডাকা হয় বলে তিনি জানান।

ঈদের পর পুলিশ কমিশনারের আদেশে পাঁচ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি অনুমোদিত হলেও ওসি জানান, অন্য এক সদস্য ছুটি থেকে না ফেরা পর্যন্ত তিনি যেতে পারবেন না। ১৬ জুন স্ত্রীর প্রসববেদনার কথা জানিয়ে আকুতি জানালেও ওসি তাকে বলেন, ‘এখন ছুটিতে যাওয়া যাবে না, আগে ভিভিআইপি ডিউটি, তারপর ছুটি।’

মামুনুর রশিদের অভিযোগপত্রে আরও লেখা হয়েছে, পুনরায় আবেদনের সময় ওসি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হাসপাতালে আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে? আপনি গেলে আজরাইল চলে যাবে? আপনি আইজিপি স্যার কিংবা কমিশনার স্যারের কাছেও বলতে পারেন, আমি ছুটি ছাড়ব না।’ এই কথোপকথনের অডিও রেকর্ড তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মেয়ে সন্তানটি মারা গেলে বাবার অপেক্ষায় না থেকে স্বজনরা তাকে দাফন করেন। অভিযোগপত্রে মামুনুর লিখেছেন, ‘আমি একজন বাবা হয়েও আমার সন্তানের মুখ জীবিত কিংবা মৃত—কোনো অবস্থাতেই দেখতে পারিনি।’ রাতে হাসপাতালে পৌঁছে তিনি দেখেন ছেলে সন্তানের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাকে সিলেটে এনআইসিইউ-তে ভর্তি করা হলেও ১৭ জুন ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেন। তিনি জানান, কনস্টেবল মামুনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন এবং তিনি দুবার ছুটির আবেদন করেছিলেন। তবে আবেদনে ‘পারিবারিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছিল, ডেলিভারির কথা নয়। তার দাবি, আবেদনগুলো যথাযথভাবে ফরোয়ার্ড করা হলেও কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমোদন মেলেনি। পরবর্তীতে বিষয়টি সরাসরি জানতে পেরে এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়। তবে প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির কারণে নবজাতক বাঁচেনি বলে তিনি দাবি করেন।

সন্তানের মৃত্যুর পর ছুটি না দেওয়া বা লাশ দেখতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ওসি বলেন, ‘আমরা তো মানুষ। এমন ঘটনা ঘটলে সহানুভূতির বিষয় আসে। আমার কাছে সব নথিপত্র আছে। অনলাইনে ছুটির আবেদনের সময়, অনুমোদনের সময় এবং তিনি কখন কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন; সব তথ্যই সিস্টেমে রয়েছে।’

মনির হোসেন আরও জানান, প্রথম ছুটির পর যোগদানের ১০-১২ দিনের মধ্যেই মামুনুরকে আরও ১৫ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, থানায় বিভিন্ন অনিয়ম ও ভাঙারি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে বিতর্কিত করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে।