রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলসহ মোট ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের সরকারি পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে 'খুলনার পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ'। সংগঠনটির দাবি, এই প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের কারণে নয়, বরং প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনার কারণে সংকটে পড়েছে। তাই বেসরকারিকরণের পথ বেছে না নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বুধবার (২৯ জুলাই) খুলনা প্রেস ক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এসব দাবি উত্থাপন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, "২০২০ সালের ২ জুলাই লোকসানের কারণ দেখিয়ে দেশের ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হলে প্রায় ৯০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।"
ocześnie জানানো হয়, একই সময়ে বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোর সংকটের মূল কারণ প্রশাসনিক অদক্ষতা, বিজেএমসির (বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন) দুর্নীতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতার অভাব।

সংগঠনটির অভিযোগ, বর্তমান সরকার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলসহ ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা দেশের শিল্প খাতের জন্য একটি 'আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত' হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ফিরতে পারেনি, বরং ঋণ নিয়ে সম্পদ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের সিদ্ধান্ত পুনরায় নেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবল উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় গেলে শ্রমিক শোষণ বাড়বে এবং দেশি-বিদেশি করপোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দেশে চিনির চাহিদা পূরণে আরও বেশি চিনিকলের প্রয়োজন থাকলেও রাষ্ট্রীয় ১৫টি চিনিকল কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ২০১০ সালে পাটজাত পণ্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রণীত 'ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট' এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই আইনটি কার্যকর হলে দেশে পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হতো বলে তারা দাবি করেন।

লিখিত বক্তব্যে পাটশিল্পের সংকটের জন্য সরকারি অবহেলার পাশাপাশি বিজেএমসির দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর নীতিগত ভূমিকাকেও দায়ী করা হয়। বক্তাদের দাবি, দেশের শিল্পায়নের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার নীতির কারণে পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত বাতিল, বন্ধ ২৫টি পাটকল পুনরায় চালু, লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের শাস্তি, বিজেএমসির প্রশাসনিক সংস্কার, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট কার্যকর বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় শিল্প পরিচালনায় সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন এবং পাটকল ও বন্ধ চিনিকলের শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধসহ ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা, সদস্য সচিব এস. এ. বাকলিদ এবং সদস্য সুতপা বেদজ্ঞসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।