বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত সয়াবিন তেলে নাইলন ও পলিইউরেথেনের ক্ষুদ্র কণা শনাক্ত করেছেন একদল গবেষক। তাদের দাবি, ভোজ্যতেলে এই দুই ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, সংগৃহীত প্রতিটি নমুনার মধ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান। শনাক্ত হওয়া ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের মধ্যে ছিল লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন, হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, পলিইউরেথেন ও নাইলন।

গবেষকেরা পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতিকে এই গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ফলাফল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের ভাষ্য, আগে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়তে এসব পলিমার পাওয়া গেলেও ভোজ্যতেলে এ দুটির উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের ধারণা, তেল উৎপাদন ও পরিশোধনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, সিলিং উপকরণ, পাইপ কিংবা প্যাকেজিংসামগ্রী থেকে পলিইউরেথেন ও নাইলনের ক্ষুদ্র কণা তেলে মিশতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সিল, আবরণ, ফোম ও সংরক্ষণসামগ্রীতে পলিইউরেথেন এবং ফিল্টার, কৃত্রিম তন্তু, যন্ত্রাংশ ও প্যাকেজিং উপকরণে নাইলনের ব্যবহার রয়েছে। উৎপাদন ও পরিবহনের সময় ঘর্ষণ বা ক্ষয়ের মাধ্যমে এসব উপকরণ থেকে ক্ষুদ্র কণা আলাদা হয়ে তেলে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

তবে তেল উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ঠিক কোন পর্যায়ে পলিমারগুলো মিশেছে, তা এই গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়নি। সম্ভাব্য উৎস নির্ধারণে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ নিয়ে আলাদা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং নন-ব্র্যান্ডেড তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকেরা আরও জানান, নমুনায় পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের অধিকাংশই ছিল তন্তু বা আঁশ আকৃতির। তাঁদের ধারণা, বাতাসে থাকা কৃত্রিম তন্তু, কর্মীদের পোশাক, প্লাস্টিকের পাত্র, উৎপাদন যন্ত্রপাতি ও প্যাকেজিং থেকে এসব কণা আসতে পারে।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

ভোজ্যতেল উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ, কারখানায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বাজারজাত তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষার ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হলেও এসব কণা মানুষের নির্দিষ্ট কোনো রোগের কারণ, এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। মানবদেহে পলিইউরেথেন, নাইলনসহ বিভিন্ন মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা।