দীর্ঘদিন ধূমপানের ফলে শরীরের যে ক্ষতি হয়, তা আর পূরণ করা সম্ভব নয় বলে অনেকের ধারণা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন; সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই শরীর নিজেকে মেরামত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। শেষ সিগারেটের মাত্র ২০ মিনিট পর থেকে শুরু হওয়া এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা, দিন, মাস এবং দীর্ঘ ১৫ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান ছাড়ার প্রতিটি পর্যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং ফুসফুসের জটিলতাসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ধূমপান ত্যাগের পর সময়ের সাথে শরীরের পরিবর্তনগুলো নিম্নরূপ:

২০ মিনিট পর: ধূমপান বন্ধ করার মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং রক্ত সঞ্চালনের উন্নতি ঘটে।

৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর: রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে, যার ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ও কোষে অক্সিজেনের সরবরাহ সহজ হয়।

২৪ ঘণ্টা পর: এক দিনের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমতে শুরু করে। রক্তনালি ও ধমনির সংকোচন হ্রাস পাওয়ায় হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ উন্নত হয়।

৪৮ ঘণ্টা পর: ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্নায়ুর প্রান্ত পুনরায় সক্রিয় হতে শুরু করে, ফলে স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৭২ ঘণ্টা পর: শরীর থেকে প্রায় পুরোপুরি নিকোটিন বেরিয়ে যায়। এই সময়ে শ্বাসনালির পেশি শিথিল হওয়ায় শ্বাস নেওয়া সহজ হয়। তবে নিকোটিন ত্যাগের স্বাভাবিক উপসর্গ হিসেবে অনেকের মধ্যে মাথাব্যথা, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ বা তীব্র ধূমপানের ইচ্ছা দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত সাময়িক।

দুই সপ্তাহ থেকে তিন মাস: রক্ত সঞ্চালন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে। ফলে ব্যায়াম বা সিঁড়ি ভাঙার সময় আগের চেয়ে কম হাঁপিয়ে যাওয়া যায়।

এক মাস পর: শরীরে শক্তির সঞ্চার হয় এবং কাশি, শ্বাসকষ্ট ও সাইনাসের সমস্যা কমতে পারে। ফুসফুসের ক্ষুদ্র সিলিয়াগুলো পুনরুদ্ধার হতে শুরু করে, যা শ্বাসনালি পরিষ্কার রাখা এবং সংক্রমণ রোধে সহায়তা করে।

ছয় মাস পর: কাশি ও কফের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং শ্বাসনালির প্রদাহ কমে আসায় দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়। অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

এক বছর পর: করোনারি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আরও উন্নত হয়।

পাঁচ বছর পর: স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। পাশাপাশি মুখ, গলা এবং স্বরযন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।

১০ বছর পর: ধূমপায়ীদের তুলনায় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে যায়। এছাড়া মুখ, খাদ্যনালি, মূত্রথলি, অগ্ন্যাশয় ও কিডনির ক্যানসারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।

১৫ বছর পর: হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি এমন পর্যায়ে নেমে আসে, যা একজন অধূমপায়ীর ঝুঁকির কাছাকাছি।

ধূমপান ছাড়ার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ:
ধূমপান ত্যাগের প্রথম কয়েক সপ্তাহে তীব্র ধূমপানের ইচ্ছা, খিটখিটে মেজাজ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, ক্ষুধা বৃদ্ধি এবং মনোযোগের অভাবের মতো অস্বস্তিকর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব সমস্যা কমে যায়। তবে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

সুস্থ জীবনের জন্য ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে কখনোই দেরি হয়ে যায় না। অভ্যাসটি ত্যাগ করলে শরীর ধীরে ধীরে নিজেকে সুস্থ করে তোলে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

সূত্র: হেল্থ লাইন