কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একটি বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুইজনে। সর্বশেষ আজ বিকেলে হিরণ মিয়া (২৮) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তিনি মিরারচর গ্রামের ফজলু মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হিরণ মিরারচর গ্রামের পক্ষে সংঘর্ষে অংশ নেন এবং এসময় তাঁর শরীরে বল্লমের আঘাত লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকায় নেওয়ার পথে বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে আজ সকালেই মাসুদ মিয়া (৩০) নামের একজন অটোরিকশাচালকের মৃত্যু হয়েছিল। এই ঘটনায় মিরারচর গ্রামের মোট দুজনের মৃত্যু হলো।

হিরণের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিদর্শক (তদন্ত) লিমন বোস জানান, সংঘর্ষ থামাতে পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাবের সদস্যরাও অংশ নেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের শতাধিক সদস্য মোতায়েন রয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে তিনি জানান।

সংঘর্ষের প্রভাবে সকাল ১০টা থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের ওপর দিয়ে এই রেলপথটি গেছে। দুই পক্ষ রেলপথের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে জামালপুর থেকে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস কুলিয়ারচরে এবং ঢাকা থেকে আসা কিশোরগঞ্জগামী আন্তনগর এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ভৈরব স্টেশনে আটকে থাকে। বেলা সাড়ে তিনটায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করে লাইন থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার পর ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ট্রেন বন্ধ থাকায় অসংখ্য যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন।

ভৈরব স্টেশনমাস্টার ইউসুফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "লাইন ক্লিয়ার হওয়ার পর প্রথমে কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকে থাকা বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভৈরবে আনা হয়। পরে ভৈরব স্টেশনে থেমে থাকা এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ট্রেন কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।"

আজ বিকেলে সংঘর্ষস্থলে দেখা যায়, রেললাইনের পাশে এবং দুটি গ্রামের সড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ টহল দিচ্ছে। আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড ও বাজারেও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সেখানে দু-একটি দোকান ছাড়া বাকি সব দোকানপাট বন্ধ এবং 곳곳ে সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান।

আকবরনগর গ্রামের মৃত সাঈদ আলীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম তাঁর ভাঙচুর হওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমি স্বামী–সন্তানহারা মানুষ। আমার কেউ নাই। দিন আনি দিন খাই। বাজারের নাম আকবরনগর হইলেই কী, আর মিরারচর হইলে কী? আমার দেড় লাখ টেহার মাল গেছে।”

স্থানীয়দের মতে, আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মধ্য দিয়ে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কটি গেছে। ১৯৯১ সালে মহাসড়কের পাশে একটি বাসস্ট্যান্ড ও বাজার গড়ে ওঠে। দুই গ্রামেরই ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতির কারণে বাজারটি দীর্ঘকাল ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল এবং সরকারি কোনো নথিতে এর নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ ছিল না।

বিরোধের সূত্রপাত ২০২৩ সালের জুলাই মাসে, যখন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সেখানে ‘উল্টো পথে আর নয়, নিয়মনীতির হবে জয়’ লেখার নিচে বাজারের নাম হিসেবে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এরপরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ওই বছরের ৯ জুলাই মিরারচর গ্রামের কিছু লোক সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। সেই সময় শুরু হওয়া সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ দুই পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন এবং অনেক দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়েছিল।