কোনো শিশু যখন কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়, সহপাঠীকে বারবার অপমান করে, ভয় দেখায় বা মারধর করে, তখন আমরা সাধারণত বলি, ‘শিশুটি খুব নিষ্ঠুর!’ তবে শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ‘খারাপ আচরণ’ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, শিশুদের সব দুষ্টুমিই নিষ্ঠুরতা নয়। অনেক সময় কৌতূহলবশত বা বিষয়টি বুঝতে না পেরে শিশুরা প্রাণীকে জোরে টিপে ধরে, পোকা মারে কিংবা বন্ধুকে ধাক্কা দেয়। তবে যদি কোনো শিশু ইচ্ছাকৃতভাবে এবং বারবার প্রাণী বা মানুষকে কষ্ট দেয়, অন্যের ভয় বা কান্না দেখে আনন্দ পায়, কোনো অনুশোচনা দেখায় না এবং দুর্বল কাউকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।
গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতার আলোকে জানা গেছে, প্রাণী বা মানুষের প্রতি এই ধরনের পুনরাবৃত্ত নিষ্ঠুরতা ‘কনডাক্ট প্রবলেম’ বা ‘কনডাক্ট ডিজঅর্ডার’ নামক আচরণগত সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন—পরিবেশে সহিংসতা দেখে শেখা যে ক্ষমতা মানেই দুর্বলকে আঘাত করা; নিজে অবহেলা, অপমান, শারীরিক শাস্তি বা বুলিংয়ের শিকার হওয়া; আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা, এডিএইচডি, শেখার সমস্যা, ট্রমা কিংবা ডিপ্রেশন; সহানুভূতি শেখার সুযোগ না পাওয়া; অতিরিক্ত মারামারির কনটেন্ট দেখা এবং পারিবারিক পরিবেশে বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত ছাড় অথবা কঠোর শাস্তির প্রবণতা।
এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকের প্রথম কাজ হলো এই আচরণটিকে অস্বীকার না করা। একই সঙ্গে শিশুকে ‘দানব’ বা ‘জন্মগতভাবে খারাপ’ বলে চিহ্নিত করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে শিশুকে বোঝাতে হবে, ‘রাগ হতে পারে, কিন্তু কাউকে আঘাত করা যাবে না।’ এছাড়া প্রাণী বা ছোট শিশুদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়মিত নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
শাস্তির পরিবর্তে এখানে ‘লজিক্যাল কনসিকুয়েন্স’ বা যৌক্তিক পরিণতির প্রয়োগ দরকার। যেমন—প্রাণীকে কষ্ট দিলে তাকে একা প্রাণীর কাছে যেতে না দেওয়া, বড়দের তত্ত্বাবধানে প্রাণীর যত্ন নিতে শেখানো এবং কোনো ক্ষতি করলে তা ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া। পাশাপাশি শিশুর ইতিবাচক আচরণকে উৎসাহিত করতে হবে। যেমন—‘আজ তুমি রাগ হলেও মারোনি, এটা ভালো সিদ্ধান্ত।’
শিশুকে সহানুভূতি শেখাতে বিভিন্ন পরিস্থিতি বা সিনারিও তৈরি করে শান্তভাবে বোঝাতে হবে। যেমন—‘ওর শরীর কাঁপছে, সে ভয় পেয়েছে’, ‘তোমার বন্ধুটি চুপ হয়ে গেছে, কারণ সে কষ্ট পেয়েছে’ অথবা ‘তুমি রাগ করেছ, কিন্তু আঘাত না করে কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে’। এছাড়া গল্প পড়া, বই পড়া, পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া এবং ছোটদের সাহায্য করার অভ্যাস সহানুভূতি গড়তে সহায়ক হয়।
এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে বুলিং বা নিষ্ঠুর আচরণকে কেবল ‘বাচ্চাদের ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নথি রাখা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, স্পষ্ট ‘এন্টি বুলিং রুল’ তৈরি করা এবং যে শিশু এমন আচরণ করছে তার জন্য বিশেষ আচরণ পরিকল্পনা করা জরুরি।
— শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের পরামর্শ অনুযায়ী।