জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত অন্যতম কৌশল ছিল 'ব্লক রেইড'। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কোনো এলাকাকে বিপুল সংখ্যক সদস্য দিয়ে ঘিরে ফেলা হতো যাতে কেউ বের হতে না পারে। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হতো।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিনে দেশজুড়ে অন্তত ৬ হাজার ২৬৪ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ২৫ জুলাই রাত থেকে ২৬ জুলাই দুপুর পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত ৭৬৫ জনকে। ঢালাও মামলা দেওয়ার পাশাপাশি এভাবে গণগ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছিল।
২০২৪ সালের ২৫ জুলাই দিবাগত রাতে রাজধানীর শাহীনবাগ এলাকায় একটি যৌথ ব্লক রেইড চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী এলাকাবাসী জানান, ওই সময় আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছিল এবং সেখান থেকে নিচে আলো ফেলা হচ্ছিল, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক ২৬ জুলাই মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘আমরা একেক দিন একেক এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছি। তারই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার শাহীনবাগ এলাকায় অভিযান চালানো হয়।’
একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিনজন সমন্বয়ককে তুলে নেয় গোয়েন্দা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক) ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা)। সেখানে আসিফের দেখভাল করছিলেন আরেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক)। হাসপাতাল থেকেই এই তিনজনকে তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
সেদিন রাত ১১টার পর ডিবি তিন সমন্বয়ককে হেফাজতে নেওয়ার কথা স্বীকার করে। এর পরবর্তী দুই দিনে আরও তিনজন সমন্বয়ক—হাসনাত আবদুল্লাহ (বর্তমানে সংসদ সদস্য), সারজিস আলম (জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক) ও নুসরাত তাবাসসুমকেও (বর্তমানে সংসদ সদস্য) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলে নেয় ডিবি। তৎকালীন ডিবির দাবি ছিল, নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সমন্বয়কদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া তাঁর ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ বইয়ে ২৬ জুলাইয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ওই বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমাদের প্রায় গৃহবন্দী করে রাখে। আমরা যাতে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে না পারি, সে জন্য তারা রাউটার খুলে ওয়াই–ফাই বন্ধ করে দেয়। সব ধরনের যোগাযোগ থেকে তারা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে।’
অন্যদিকে, ২৬ জুলাই সকালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা বক্তব্য দেন। সমাবেশে ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়।