মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে উচ্ছেদ অভিযানের সময় একটি পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০টি কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, নিয়মিত মাসোহারা দেওয়া বন্ধ করায় ফল ধরার আগমুহূর্তে তাদের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে বন বিভাগের ভাষ্য, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ফলের বাগান উচ্ছেদে আইন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ঘটনার পর সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। তদন্ত শেষে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বিট এলাকায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), বন বিভাগ ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। বন বিভাগের দাবি, অভিযানে রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনের ২০ ধারাভুক্ত প্রায় পাঁচ একর বনভূমি স্থানীয় দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বাগানটি যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে রোপণের পরপরই বা এক-দুই বছরের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন। আট বছর ধরে গাছ বড় হওয়ার পর ফল ধরার সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে কেন—এ নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিযোগ, শুরু থেকেই তারা সংশ্লিষ্ট বন বিট কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা দিতে না পারায় পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
বাগানের মালিক সালমা বেগম বলেন, গত আট বছরে বাগান গড়ে তুলতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বেশির ভাগই বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আরও প্রায় তিন মাস পর ফল বিক্রি করে ঋণের বড় অংশ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেছে।
সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লার দাবি, সংরক্ষিত বনের প্রায় তিন একর জায়গায় তারা কমলা, পেঁপে ও লাউয়ের চাষ করেছিলেন। তাদের হিসাবে, ফল বিক্রি করে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি জমি উদ্ধারের আড়ালে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে এ অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, সম্প্রতি বন বিভাগের বিরুদ্ধে কথিত লিজ–বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একমাত্র সেচযন্ত্রও ভেঙে ফেলার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, এতে অবশিষ্ট গাছগুলোও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসার পর তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান বলেন, গাছ কাটার ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, তদন্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা এবং আইনগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
এর আগে ১৬ জুলাই রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিন্জি এলাকায় পরিচালিত যৌথ অভিযানে প্রায় পাঁচ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করার কথা জানায় বন বিভাগ।