চব্বিশের জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে এক বৃদ্ধ রিকশাচালকের কথা। ১৯ জুলাই সকালে তিনি মালিবাগের রাস্তায় নেমেছিলেন। আগের দিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দুই রিকশাচালক নিহত হওয়ায় সেই প্রতিবাদের অংশ হতে এসেছিলেন তিনি।

পুলিশ গুলি শুরু করলে আমরা একটি গলিতে আশ্রয় নিই। কিন্তু সেই গলির মুখে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ লোকটি অন্যদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘চাচা, ভিতরে চলে আসেন। গুলি লাগবে।’ বৃদ্ধ লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘গুলি লাগলে ভালো। কালকে থেকে আর বাড়িতে বিকাশ করতে হবে না।’

লোকটির এই একটি বাক্য আমাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। বুঝতে পারলাম, এ দেশের বহু মানুষের কাছে মৃত্যু কখনো কখনো জীবনের চেয়ে কম কষ্টের মনে হতে পারে। সেদিন রাতেই কারফিউ জারি হয়। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু প্রিয়র মরদেহ খুঁজছিলাম। হাসপাতালের সেই দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। মর্গে জায়গা না থাকায় বাইরে মরদেহ রাখা হচ্ছিল। জরুরি বিভাগের সামনে শুধু আহত আর আহত। একের পর এক গুলিবিদ্ধ মানুষ আসছিল, আর ডাক্তাররা একটানা কাজ করতে করতে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছিলেন।

সেই রাতের ভয়াবহতা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। আমি যেন নিজের ভেতরে ছিলাম না। চিৎকার করে বলছিলাম, ‘শেখ হাসিনা এ দেশে থাকতে পারবে না। দেশ ছেড়ে পালাতে পারবে না।’ আসলে আমার হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। হাসপাতালের পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরেছিল, শেষ পর্যন্ত দুই সাংবাদিক বন্ধু আমাকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসেন। ‘সেই রাতেই মাথায় জেদ উঠে গিয়েছিল, শেখ হাসিনার শাসন আর নয়। এবারই তাঁর পতন হতে হবে।’

পরবর্তী ঘটনাগুলো সবার জানা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করল যে, জনতা পথে নেমে পড়লে যে কোনো স্বৈরাচারই টিকে থাকতে পারে না। ২ আগস্টের দ্রোহযাত্রার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আন্দোলন চললেও বহু মানুষ একসঙ্গে শরিক হতে পারছিলেন না। তাই প্রথমের শোকযাত্রা কর্মসূচির বদলে আন্দোলন বেগবান করতে আমরা তার নাম দিই ‘দ্রোহযাত্রা’। আমরা জানতাম না কারা কীভাবে আসবে, কিন্তু মিছিল বের হতেই হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমায়। ‘মানুষের সেই অবিরাম ঢল দেখে পুলিশও পালিয়ে গেল। মিছিল যখন পুলিশের সব বাধা পেরিয়ে শহীদ মিনারে পৌঁছাল, তখনই উপলব্ধি করেছিলাম, শেখ হাসিনার পতন শুধু সময়ের ব্যাপার। মানুষ সেটাই ঘটিয়ে ছাড়ল।’

তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের মধ্যে যে নতুন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। একটি সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে দিয়ে অধিকতর জনগণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের অনেক বিপ্লবের মতোই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও আমরা রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটাতে পারিনি। এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই প্রতিশোধের রাজনীতি এবং উগ্রবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটেছে।

যেকোনো অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—এর পর কী? সরকার পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনা, মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠান গঠন, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার স্পষ্ট উত্তর না থাকলে সেই শূন্যস্থান অন্য কেউ পূরণ করে। রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না; হয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, নয়তো উগ্রতা জায়গা করে নেয়।

বাংলাদেশেও আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল না। এই সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিশোধের সংস্কৃতি। দমন-পীড়নের শিকার সমাজে প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু প্রতিশোধ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্র অপরিশোধিত আবেগ দিয়ে পরিচালিত হলে নতুন অন্যায়ের জন্ম হয়।

এমন পরিস্থিতিতেই উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এটি কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক বা আদর্শিক উগ্রতাও হতে পারে, যা সমাজকে ‘আমরা’ ও ‘ওরা’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখার ফলে গণতান্ত্রিক সমাধানের পথ সংকুচিত হয়। বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে এই বিভাজন আরও বিপজ্জনক। তাই বর্তমান সময়ে সামাজিক গণতন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক গণতন্ত্র মুক্ত নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতার সমন্বয় ঘটাতে চায়।

সামাজিক গণতন্ত্র বিশ্বাস করে বাজার থাকবে, কিন্তু বাজার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে না। রাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে না। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের বেকারত্ব, বৈষম্য এবং শহর-গ্রামের ব্যবধান দূর করতে জিডিপির বৃদ্ধির চেয়ে এমন রাষ্ট্র প্রয়োজন, যা নাগরিককে অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখবে এবং সংলাপে গুরুত্ব দেবে।

গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা করা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন না করে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করাই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা হলো রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়, বরং সবার। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হতে হবে সংবিধান, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন।

‘জুলাই আমাদের পরিবর্তনের সাহস দিয়েছে। তবে সাহসই যথেষ্ট নয়। সাহসকে স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আবারও যদি আমরা ব্যক্তিপূজা, প্রতিশোধের রাজনীতি বা উগ্র মতাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করি, তাহলে ইতিহাস আমাদের একই চক্রে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।’

আজ আমাদের এমন এক বাংলাদেশ প্রয়োজন, যেখানে সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলা হবে না, বিরোধী দলকে শত্রু মনে করা হবে না এবং সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক বা শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারবেন। যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন রক্তপাতে নয়, বরং নির্বাচনে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন পথ বেছে নিই তার ওপর। একদিকে বিভাজন ও ঘৃণার পথ, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পথ। এই দ্বিতীয় পথটিই হলো সামাজিক গণতন্ত্র। অনেকে উগ্রপন্থার উত্থানে হতাশ হলেও আমি নই। জুলাইয়ের পর মানুষের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠেনি, আর সেই শক্তিই আমাদের গড়ে তুলতে হবে। যে অনুপ্রেরণায় আমরা জুলাইয়ের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, সেই লড়াই এখনো চলছে। বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করবেই।

— অনীক রায়: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও রাজনৈতিক কর্মী।