উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি আজও আবাসনসংকট, অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্প, গবেষণায় সীমিত সুযোগ এবং অবকাঠামোগত নানা সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে। প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হলে আসন মাত্র ৮২৪টি।

অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প শেষ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমার বদলে আরও বেড়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও বেরোবির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায়। তাই প্রশ্ন উঠছে—উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই উন্নয়নের অগ্রাধিকার পাচ্ছে, নাকি এখনো অবহেলার বৃত্তেই আটকে আছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬টি অনুষদের অধীন ২২টি বিভাগে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। আবাসিক হলে আসন মাত্র ৮২৪টি, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১০ শতাংশের জন্যই যথেষ্ট। বর্তমানে ছেলেদের জন্য বিজয়-২৪ হল ও শহীদ মুখতার ইলাহী হল এবং মেয়েদের জন্য একমাত্র শহীদ ফেলানী হল চালু রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নির্মাণাধীন ১০ তলাবিশিষ্ট বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রী হলের কাজ আবার শুরু হলেও তা এখনো শেষ হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এর সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মেসনির্ভর আবাসনব্যবস্থা। অতিরিক্ত ভাড়া, অনিরাপদ পরিবেশ ও নানা ধরনের অনিয়ম মেনে নিয়েই অনেক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে নারী শিক্ষার্থী এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর।

আবাসনসংকটের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম ভাস্কর্য ‘স্বাধীনতা স্মারক’। ২০১২ সালে জনতা ব্যাংকের অনুদানে নির্মাণকাজ শুরু হলেও আজও প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়নি। এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক পাঁচজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালে দুর্নীতির অভিযোগের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্বাধীনতা স্মারক, রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্রী হলের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলের নির্মাণকাজ আবার শুরু হলেও অগ্রগতি খুবই ধীর। আর স্বাধীনতা স্মারকের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঘোষিত এসব প্রকল্পের সুফল থেকে শিক্ষার্থীরা এখনো বঞ্চিত। উন্নয়ন প্রকল্পের এমন দীর্ঘসূত্রতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বাস্তবায়নের গতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্নের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজ পাতায় আবার অন্তর্ভুক্ত হওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর সম্প্রসারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ‘আবু সাঈদ তোরণ ও মিউজিয়াম’ এবং ‘শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই এসব স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও এখনো সেখানে দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। একই প্রকল্পের আওতায় ১২ তলা একাডেমিক ভবন, তিনটি ১০ তলা ছাত্র হল, দুটি ১০ তলা ছাত্রী হল, সমন্বিত অ্যাক্টিভিটি সেন্টার, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন, লাইব্রেরি সম্প্রসারণ, সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি এখনো একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি বেরোবির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দেয়। এর আগেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা এসেছে, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে বছরের পর বছর বিলম্ব হয়েছে। তাই এবার শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা একটাই—এই মেগা প্রকল্প যেন কেবল কাগজে-কলমে বা ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখুক।

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ একেবারেই নেই, এমনটিও বলা যাবে না। বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে থিসিস করা শিক্ষার্থীদের ২৫ হাজার টাকা করে গবেষণা স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছে, যা গবেষণাকে উৎসাহিত করার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বর্তমান সময়ে একটি মানসম্মত গবেষণা পরিচালনায় মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ভ্রমণ, বই ও জার্নাল, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য গবেষণাসংক্রান্ত ব্যয় বিবেচনায় এই সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। একই সঙ্গে একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে শুধু স্কলারশিপ নয়, আধুনিক গবেষণাগার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ এবং গবেষণা খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু নতুন ভবন নির্মাণে নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত অর্থে মূল্যায়িত হয়।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে গতি আসবে, আবাসনসংকট দূর হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি তার প্রাপ্য গুরুত্ব ফিরে পাবে—এমন আশাই করেছিলেন সবাই। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পুরো প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। উত্তরবঙ্গের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বেরোবিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তাই প্রয়োজন শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নয়; প্রয়োজন নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করা। কারণ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাগজে-কলমে নয়, তার সুফল শিক্ষার্থীদের জীবনে কতটা পৌঁছেছে—সেই বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস হয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার এই বাতিঘরকে আর প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় নয়, বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব এখন সংশ্লিষ্ট সবার।

লেখক: ফারহানা মীম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর