জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের কালজয়ী শিল্পকর্মগুলো। প্রদর্শনীতে মূল শিল্পকর্ম ছাড়াও আলোকচিত্র আছে ৪৩টি। রয়েছে নভেরা আহমেদের ব্যবহার করা কিছু পোশাক ও সামগ্রী।
প্রদর্শনী শুরুর পর থেকেই দর্শকের দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে প্রবেশপথের ঠিক সামনে রাখা ভাস্কর্যে—মা দুই সন্তানকে নিয়ে যেন অভ্যর্থনা করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ক্বাবেদুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে বুধবার জাতীয় জাদুঘরে এসে ভাস্কর্যটি দেখে মুগ্ধ হন। ক্বাবেদুল ইসলাম পেশায় ব্যবসায়ী, তাঁর মেয়ে তানহা ইসলাম অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ভাস্কর্য বা চিত্রকলার নিয়মিত দর্শক না হলেও জাদুঘরে ঘুরতে এসে তাঁদের জন্য এই প্রদর্শনী বাড়তি প্রাপ্তি বলে জানান ক্বাবেদুল। তিনি বলেন, নভেরার জীবনী সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত লেখা আছে। তাঁর শিল্পকর্মগুলো তাঁদের অনেক ভালো লেগেছে।
নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের একটি প্রধান বিষয় ছিল পরিবার। বিদগ্ধজনেরা সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি দেশে প্রাপ্য উপাদান ব্যবহার করেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাপের এসব পারিবারিক সম্পর্কের ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছিলেন। সেখানে আছে মায়ের সঙ্গে সন্তান—কোনোটিতে সন্তানের হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে মা, কোনোটিতে সন্তান কোলে মা।
প্রদর্শনীতে আরও দেখা যাচ্ছে বাবা-মা-সন্তান একসঙ্গে, পাশাপাশি দাঁড়ানো দম্পতি—এমন বেশ কিছু বিন্যাসে তৈরি ভাস্কর্য। কয়েকটিতে দুটি অবয়ব, আবার কয়েকটিতে তিন বা চারটি। নভেরা আহমেদ এসব অবয়ব বিভিন্ন কায়দায় সাজিয়েছেন। চিরন্তন অপত্যস্নেহ, প্রীতি, মমতা ও দায়িত্ববোধের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা নিবিড় পারিবারিক বন্ধন উপস্থাপন করা হয়েছে নান্দনিক সুষমায়। সাধারণ ভাস্কর্যের মতো নাক-মুখ-চোখের গড়ন না থাকলেও দর্শকদের নিজের সহজাত উপলব্ধি দিয়ে পারিবারিক সম্পর্কের চিরন্তন মাধুর্য অনুভব করতে অসুবিধা হয় না—এমনভাবেই প্রতীয়মান হয় বলে জানা যায়।
শুধু পরিবার-কেন্দ্রিক কাজই নয়, প্রদর্শনীতে আছে গরু নিয়ে কৃষক, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা নারী, তথাগত গৌতম বুদ্ধের ধ্যানস্থ মস্তক, শামুক—এমন আলাদা ধরনের বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য। সব মিলিয়ে প্রদর্শনীতে ২৯টি ভাস্কর্য রয়েছে। বেশির ভাগই করা হয়েছে সিমেন্ট-বালু ব্যবহার করে। ব্রোঞ্জের ছোট আকারের কাজ আছে কিছু। ভাস্কর্য তৈরিতে নভেরা আহমেদ প্রধানত সহজলভ্য স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন। তিনি সিমেন্টের কোনো কোনো ভাস্কর্যের সঙ্গে গোলাপি বা সাদা রং প্রয়োগ করেছেন, কোনটি কালো। কোনোটিতে আবার ধূসর সিমেন্টের মূল রং অপরিবর্তিত রেখেছেন।
ভাস্কর্য ছাড়াও প্রদর্শনীতে রয়েছে তিনটি রিলিফ ও মূল চিত্রকর্ম। রিলিফগুলোতেও তিনি পারিবারিক সম্পর্কের আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে করা চিত্রকর্মগুলোতেও প্রাধান্য পেয়েছে পারিবারিক বন্ধনের বিষয়গুলো। প্রদর্শনীতে চিত্রকর্ম আছে ১১টি। এ ছাড়া কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতের দৃশ্য, চন্দ্রালোকিত আকাশ, শকুন, টিয়া পাখি, ছাগল ইত্যাদি চিত্রকর্মের মধ্যেও স্থান পেয়েছে। শিল্পী উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করেছেন।
প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের পাশাপাশি এক পাশের দেয়ালজুড়ে বিশালকায় বোর্ডে তুলে ধরা হয়েছে দেশের এই বরেণ্য ভাস্করের জীবনের কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জি। সময়ের ধারাবাহিকতায় দর্শকেরা নভেরার জীবনের উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলো পাবেন। আরেকটি দেয়ালে একই রকম বড় আকারের বোর্ডে আছে নভেরাকে নিয়ে লেখক ও গবেষক শিকোয়া নাজনীনের একটি লেখা। এতে তিনি নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক ভাস্কর্য কলায় তাঁর অবদান তুলে ধরেছেন। লেখা ও জীবনপঞ্জিতে চোখ বুলিয়ে শিল্পকর্মগুলোর সামনে দাঁড়ালে এই শিল্পের সৌন্দর্য–মর্মার্থ উপলব্ধি করার আনন্দ বাড়ে—এমনটাই দেখা যায় দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়ায়।
প্রদর্শনীতে আরও রয়েছে নভেরা আহমেদের জন্ম ও শিক্ষা-জীবনসংক্রান্ত তথ্য। নভেরা আহমেদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ। তিনি লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস থেকে ভাস্কর্য ও নকশা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পঞ্চাশের দশকে তাঁর হাত দিয়েই বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যের সূচনা হয়। তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত শতাধিক ভাস্কর্য সৃষ্টি করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশার কাজেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সত্তরের দশকে নভেরা স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন। প্যারিসে ২০১৫ সালে এই বরেণ্য ভাস্করের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এমন আরও বিস্তারিত তথ্য রয়েছে প্রদর্শনীতে।
জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত এই প্রদর্শনীর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি। জাদুঘরের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মগুলোই উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।
বিকেলে প্রদর্শনী উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন ‘গ্যালারি ওয়াক: শিকোয়া নাজনীনের সাথে’ (নভেরাকে নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘নভেরা: শিল্পের রহস্য মানবী’, প্রথমা প্রকাশন, ২০২১)। শিকোয়া নাজনীন বলেন, ‘নভেরা কোনো ছকবাঁধা নিয়মে কাজ করেননি। তিনি অনেক বড় এক জীবনের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মধ্য একধরনের নির্জনতা রয়েছে, রয়েছে আধ্যাত্মিকতা। এই ভাস্কর্যগুলোর সামনে দিয়ে গেলে মনে হবে যেন তারাও দর্শকদের দেখতে পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা বিস্ময়কর।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম আবদুল্লাহ ও জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম। সভাপতিত্ব করেন জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। স্বাগত বক্তব্য দেন জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম।
নভেরা আহমেদের এত শিল্পকর্ম একসঙ্গে দেখার সুযোগ সচরাচর মেলে না। এবারের এই প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, ব্যক্তিগত স্মারক ও জীবনপঞ্জি—সব মিলিয়ে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে দেশের ভাস্কর্যের পথিকৃতের সৃজন জীবনের বিস্তারিত চিত্র। ফলে প্রদর্শনীতে এসে দর্শকেরা নভেরা অনবদ্য সৃজনকর্ম উপভোগের আনন্দ পাবেন এবং একই সঙ্গে তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগও পেতে পারেন।






