রাজধানীর সচিবালয় মেট্রোস্টেশন থেকে পল্টন মোড়ের দিকে কিছুটা এগোতেই বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ফুটপাতে এক করুণ দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে এক ছোট্ট শিশুকে দড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছে, যা দেখে পথচারীদের মাঝে ভিড় জমে যায়।

ফুটপাতের লোহার রেলিংয়ের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল আড়াই বছর বয়সী শিশু মেহেদী। খালি গায়ে সামনে একটি প্লাস্টিকের বাটি নিয়ে শিশুটি হামাগুড়ি দিচ্ছিল এবং ভিড়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দড়ির বাঁধনে বাধা পেয়ে সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।

কিছুক্ষণ পর ছেঁড়া বস্তায় প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে সেখানে ছুটে আসেন শিশুটির মা মুক্তা। কোমরে দড়ি বাঁধার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কী করতাম। বোতল টুকাইতে গেছি। পুলাডা রাস্তার দিকে দৌড় দেয়। বাইন্দা যাওন ছাড়া উপায় আছে?’

ফুটপাতে থাকার বিষয়ে মুক্তা জানান, ‘আমাগো কী ঘরবাড়ি আছেনি। পুলাডা লইয়া অসহায়। এইহানেই শুইয়া থাহি। তাড়ায়া দেয় মাঝেমইধ্যে। যামু কই?’

জানা গেছে, মুক্তার বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায়। প্রথম স্বামীর ঘরে তাঁর দুই সন্তান থাকলেও দ্বিতীয় বিয়েতে জন্ম নেয় মেহেদী। তবে মেহেদীর জন্মের আগেই স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই, পল্টনের এই ফুটপাতই এখন তাঁদের একমাত্র ঠিকানা।

জীবনসংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মুক্তা বলেন, ‘পুলাডার খাওয়া হয় না। সারা দিন এহানে শুইয়া–বইসা থাহে। আমি বোতল টুকাইয়া দশ টেহা বিশ টেহা পাই। কেউ কিছু দিলে পুলাডারে খাওয়াইতে পারি। না দিলে না খাইয়্যা থাহে।’

পেছনের বাণিজ্যিক ভবনের এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে এই মা ও শিশুকে ওই ফুটপাতেই দেখছেন তিনি। শিশুটিকে দড়িতে বেঁধে রাখাই এখন মায়ের নিয়মিত অভ্যাস।

এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত পথচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আক্ষেপ তৈরি হয়। ইমরান হোসেন নামের এক পথচারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মেট্রো থেকে নেমে দূর থেকেই ভিড় দেখি। প্রথমে অবয়ব দেখে ভেবেছি, হয়তো কোনো বানরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। কিন্তু কাছে আসতেই ভুল ভাঙে। খুবই খারাপ লেগেছে। কোনো মানবশিশু এভাবে বেড়ে উঠতে পারে? রাষ্ট্রেরও তো একটা দায়িত্ব আছে।’