জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে রায় হয়েছে। মানবতাবিরোধী এ ঘটনার পর মো. নাদিম হোসেন ও মায়া ইসলাম নিহত হন এবং আমির হোসেন ও বাসিত খান মুসা গুরুতর আহত হন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ বুধবার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে বলে মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এস এম মইনুল করিম। পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১৪৭ পৃষ্ঠার।
গত ২৮ জুন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করেন। এ ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
রায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে আরও বলা হয়েছে, এই তিন আসামিই পলাতক।
এ ছাড়া সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে (পলাতক) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে (গ্রেপ্তার) ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরায় একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবক আমির হোসেন পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। সেদিন গুলিবিদ্ধ হন মায়া ইসলাম নামের এক নারী ও তাঁর নাতি বাসিত খান (৭)। রামপুরা এলাকায় মো. নাদিম নামের আরও এক ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। একই ঘটনায় মায়া ইসলাম মারা যান এবং তাঁর নাতি গুরুতর আহত হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, এটি প্রমাণিত যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ নিরস্ত্র ছিল। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর তাঁর অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের বেতার বার্তায় আন্দোলনকারীদের ওপর সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ করতে কোনো দ্বিধা না করার জন্য বলেন। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী মসজিদের সামনে নাদিমকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। একই দিন বনশ্রীতে নিজের বাড়ির কলাপসিবল গেটের ভেতরে মায়া ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। আর বাসিত খান মুসাকে মারাত্মকভাবে জখম করে। রামপুরার নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে রড ধরে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করেন সাবেক এসআই তরিকুল ও সাবেক এএসআই চঞ্চল।
রায়ে বলা হয়েছে, নাদিম ও মায়া ইসলামকে হত্যা এবং বাসিত খান মুসা ও আমির হোসেনকে গুরুতরভাবে জখম করার ঘটনায় হাবিবুর, রাশেদুল ও মশিউরের দায় পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রায়ে বলা হয়, অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় এই তিন আসামির (হাবিবুর, রাশেদুল ও মশিউর) বিরুদ্ধে যে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে, তার প্রতিটির জন্যই সর্বোচ্চ সাজা পাওয়ার যোগ্য। তবে তাঁদের প্রত্যেককে একটি একক সাজা প্রদান করা সমীচীন।
পলাতক সাবেক এসআই তরিকুল ও সাবেক এএসআই চঞ্চল—এই দুজনের বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে, তাঁরা পুলিশের গুলির আঘাতে ভুক্তভোগী আমির মারা যাননি, এসব বিবেচনায় এ দুজন অপেক্ষাকৃত কম সাজার যোগ্য।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও বলা হয়, এ ছাড়া সাবেক এএসআই চঞ্চল পালিয়ে যাননি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে হেফাজতে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। তিনিই একমাত্র অভিযুক্ত যিনি অবিলম্বে সাজা ভোগ করছেন। ফলে তিনি সাজার ক্ষেত্রে আরও কিছুটা রেহাই পাওয়ার যোগ্য।






