‘হাওয়া’র চার বছর পর পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের নতুন চলচ্চিত্র ‘রইদ’ মুক্তি পেয়েছে। গত ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি বর্তমানে দেশে ও বিদেশে প্রদর্শিত হচ্ছে। গত শুক্রবার রাতে রাজশাহীর পথে মনজুর কাদেরের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় পরিচালক সুমন ‘রইদ’-এর নেপথ্য গল্প এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

‘রইদ’ প্রচলিত প্রেমের গল্পের বাইরে এক ভিন্ন আঙ্গিকের চলচ্চিত্র। সাধু ও পাগলির সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষের কোন অনুভূতিকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তরে মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, “‘রইদ’ পরিপূর্ণ প্রেমের গল্প; কিন্তু প্রেমের আড়ালে আমি আরও কিছু প্রশ্ন ও ভাবনার দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছি। হাজার বছরের পুরোনো আখ্যান, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ককে ঘিরে সমাজ ও রাজনীতির যে ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোও আমাকে ভাবিয়েছে। বিশেষ করে নারী সব সময় পুরুষের অধীন—এই প্রাচীন ধারণা বিভিন্ন দিক থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি। সেই ভাবনা থেকেই সাধু ও পাগলির সম্পর্ককে দেখেছি। তাদের গল্প বলতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, মানুষের প্রাপ্তি যতই হোক, আকাঙ্ক্ষার শেষ হয় না; বরং নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে এ অনুভূতিই আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করেছে।”

চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করতে পরিচালক ও তার কলাকুশলীদের দীর্ঘ সময় সিলেটের শাহ আরেফিন টিলায় অবস্থান করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “সাধু, পাগলিরা প্রকৃতিরই সন্তান। তাদের সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে এবং পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সেই জীবনযাত্রার ভেতরে যাওয়া প্রয়োজন। সে কারণেই দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার পথটা বেছে নেওয়া। এর মধ্য দিয়েই চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে সবার যোগাযোগ তৈরি হয়। আমার কাছে ছবি নির্মাণের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি। তবে এটি শুধু আমার ইচ্ছায় সম্ভব নয়, আমার টিমের মানুষজনও এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে বলেই সম্ভব হয়।”

তিনি আরও জানান, ‘হাওয়া’র প্রায় একই টিম নিয়ে ‘রইদ’ নির্মাণ করায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নির্মাণ প্রক্রিয়ার আনন্দ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি সিনেমা নির্মাণের পুরো যাত্রাটাই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে প্রস্তুতি, শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে সময় কাটানো, শুটিং—পুরো সময়টাই আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের। ছয় মাস, আট মাস বা দশ মাস—যত দীর্ঘই হোক, এ সময়ই শেষ পর্যন্ত স্মৃতি হয়ে আমার সঙ্গে থাকে।”

ছবির একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে দীর্ঘ আট-নয় মাস ধরে তৈরি করা সেট এবং ৫০ হাজার গাছ পুড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে সুমন বলেন, “যখন ‘রইদ’-এর জন্য বাড়িটা বানানো শুরু হয়েছিল, তখন সেখানে কোনো গাছপালা ছিল না, এমনকি ঘাসও ছিল না। মাটি ফেলে, গাছ লাগিয়ে, ধীরে ধীরে জায়গাটা গড়ে তোলা হয়েছিল। আমি কয়েকজনের নাম বিশেষভাবে বলতে চাই—নিজাম ভাই, সানি, নসিব, জোহান, বাবলু বোস, আবুল, শাহীন, আলামিনসহ অনেকে। তারা প্রায় আট–দশ মাস ধরে সেখানে নিরলস কাজ করেছেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরও ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। এই দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁদেরই, যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে বাড়িটা গড়ে তুলেছিলেন। বাড়িটা শুধু একটি সেট ছিল না, আমাদের সবার কাছে একধরনের আপন জায়গা হয়ে উঠেছিল। শুরুতে আমরা প্রতি সপ্তাহে কয়েক দিন করে সেখানে থাকতাম। পরে কাজ যত এগিয়েছে, আমাদের থাকাও তত বেড়েছে। শেষের দিকে টানা দুই–তিন মাস আমরা সেখানে থেকেছি। বাড়িটাতে রান্না করেছি, খেয়েছি, ঘুমিয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। ফলে সেটার সঙ্গে আমাদের একধরনের গভীর আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।”

স্ক্রিপ্টে বাড়িটি পোড়ানোর কথা আগে থেকেই থাকলেও বাস্তব মুহূর্তটি ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমরা অবশ্য শুরু থেকেই জানতাম, গল্পের প্রয়োজনে একসময় বাড়িটা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। স্ক্রিপ্টে সেটি ছিল। এমনকি আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর যেসব অংশ আবার দরকার হবে, সেগুলোর বিকল্প প্রস্তুতিও আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জানার পরও যখন সেই মুহূর্ত সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন অনুভূতিটা একেবারেই অন্য রকম হয়ে যায়। বাড়ি পোড়ানোর আগের দিন পুরো ইউনিটে একটা থমথমে পরিবেশ ছিল। সবাই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলাম। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন গাছে পানি দিয়েছে, বাড়িটি গড়ে তুলেছে, তাদের আবেগ ছিল আরও বেশি। আগের দিন সন্ধ্যায় যখন কথা উঠল, আগুনে পুড়ে যেতে পারে এমন কিছু গাছের গোড়া কেটে রাখা হবে, তখন বিষয়টা আর শুধু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে একধরনের মায়া, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের অনুভূতি কাজ করছিল।”

শুটিংয়ের সেই মুহূর্তের তীব্রতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “যেদিন সত্যি সত্যি বাড়িটা পুড়ছিল, আমরা শুটিং করছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনে হচ্ছিল আমাদের চোখের সামনে যেন কোনো বড় বিপর্যয় ঘটছে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বাড়িটাকে কেউ সেট হিসেবে দেখেনি। কারণ, সেটি আমাদের কাছে বসবাসের জায়গা ছিল, অসংখ্য স্মৃতি আর সময়ের অংশ ছিল। তাই নির্মাতা হিসেবে আমার ভেতরে আসলে দুটি অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করছিল। একদিকে সিনেমার জন্য দৃশ্যটি ধারণ করতেই হবে, অন্যদিকে এত দিনের শ্রম, মায়া আর স্মৃতির জায়গাটাকে নিজের চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখা সহজ ছিল না। ইউনিটের অনেকেই চাইছিল, যদি বাড়িটা আরও কিছুদিন পরে পোড়ানো যেত। কিন্তু শুটিংয়ের বাস্তবতা এবং পরিকল্পনার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পুরো বিষয়টা শুধু একটি দৃশ্য ধারণের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি দীর্ঘ জীবনযাপনের অংশের সমাপ্তি। সেই অনুভূতিকে পুরোপুরি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ‘হাওয়া’তেও আমাদের যেমন অনেক ইন্টারেস্টিং মুহূর্ত আছে, রইদ–এও অনেক ইন্টারেস্টিং মুহূর্ত আছে এবং সেটা খুবই ডিফারেন্ট। কখনো কখনো সিনেমা থেকেও বেশি সেই অনুভূতিটা।”

‘রইদ’ সিনেমায় প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের সক্রিয় উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে সুমন বলেন, “আমি মনে করি, মানুষ নিজেই প্রকৃতি। মানুষকে প্রকৃতির বাইরে কোনো সত্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা যেন ভুলে গেছি যে আমরাও প্রকৃতিরই অংশ। ‘রইদ’-এ আমি যে সাধু ও পাগলির গল্প বলেছি, তারা আসলে সেই মানুষদের প্রতিনিধি, যারা এখনো প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বেঁচে থাকে। হাজার বছরের পুরোনো আখ্যান ও বিশ্বাসের ভেতর থেকে আমি তাদের গল্পকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। গল্পটি হয়তো বর্তমান সময়ের, কিন্তু আমি চাইনি দর্শক এটিকে শুধু বাস্তবতার সীমার মধ্যে থেকে দেখুক। বাস্তবতার বাইরে যেয়েও জিনিসটাকে দেখতে চেষ্টা করেছি এবং সেই চেষ্টা করতে গিয়ে আমি যে প্রকৃতিকে ধরতে চেয়েছি সেই প্রকৃতিতে সাধু ও পাগলি প্রকৃতির সন্তান হয়ে ওঠে। সেই কারণেই প্রকৃতি এখানে শুধু পটভূমি নয়, গল্পের একটি সক্রিয় অংশ। সাধু ও পাগলি প্রকৃতির সন্তান, তাদের চারপাশের প্রতিটি প্রাণীও। পিঁপড়া থেকে শুরু করে গরু, মহিষ, খরগোশ, ব্যাঙ, শিয়াল—সব প্রাণিকুলকে আমি তাদের জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে, এই দুই চরিত্রকে বুঝতে হলে তাদের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।”

প্রকৃতির সংকেত ও মানুষের বিশ্বাসের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, “ছবিতে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে প্রকৃতির একটি সংকেত মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। যেমন একটি তাল পড়ার ঘটনাও পাগলির ফিরে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। আধুনিক সমাজে আমরা হয়তো এমন বিষয় সহজে বিশ্বাস করি না। আধুনিকতা আমাদের সেই বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একসময় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশেই বাস করত। প্রকৃতির সংকেতকে তারা অর্থপূর্ণ মনে করত, অনেক ক্ষেত্রে সেটিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করত, কখনো কখনো ঈশ্বর মনে করত। আমি সেই মানুষদেরই ধরতে চেয়েছি, যারা এখনো প্রকৃতির ভাষা ও সংকেতকে বিশ্বাস করে। সাধু ও পাগলি আসলে সেই জগতের মানুষ। তাদের জীবন, তাদের সম্পর্ক, তাদের বিশ্বাস—সবকিছুই প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ‘রইদ’ তাদের বাড়ি, তাদের জীবনযাপন এবং চারপাশের প্রাণিকুল—সবকিছুই সেই ভাবনা থেকে নির্মিত।”

‘হাওয়া’র সাফল্যের পর দর্শকদের প্রত্যাশার চাপ নিয়ে তিনি বলেন, “‘হাওয়া’র সাফল্যকে আমি চাপ হিসেবে নিতে চাইনি। বরং সেখান থেকে সাহসই পেয়েছি। হাওয়া নির্মাণের সময় আমরা বাংলা সিনেমার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে একটি গল্প বলার চেষ্টা করেছিলাম। দর্শক সেটাকে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের ভালোবাসা আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছে, আরও ভিন্নধর্মী গল্পও দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আমি কখনোই মনে করি না, দর্শক বুঝবেন না বা জটিল কোনো ভাবনা গ্রহণ করতে পারবেন না। বরং দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বও নির্মাতার।”

বর্তমান সময়ে গল্পের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের গল্পের সংকট নেই, বরং নিজের গল্প না করে আমরা অন্যের গল্প কিংবা অনুকরণের গল্প হয়ে উঠেছি। আমাদের নিজস্ব গল্প আমরা বিশ্বাস কম করেছি; কিন্তু খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের সিনেমার ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে, যেখানে আমাদের গল্পই দর্শক–হৃদয় জয় করেছে। ১৯৬৩ সালে ‘রূপবান’ মুক্তির সময় উর্দু ও হিন্দি সিনেমার প্রভাব ছিল। তখনকার বাস্তবতায়ও ‘রূপবান’ দর্শকপ্রিয় ও ব্যবসাসফল হয় এবং ছবির গল্পের কেন্দ্র একজন নারী চরিত্র। পরে ‘সারেং বৌ’–এর মতো আরও অনেক চলচ্চিত্র আমাদের এই অঞ্চলের সিনেমার গল্প বয়ানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমার মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিজেদের গল্পের শক্তির ওপর বিশ্বাস না থাকা। আমরা অনেক সময় পাশের দেশে কী হচ্ছে, ইউরোপে কী হচ্ছে বা হলিউডে কী হচ্ছে, সেদিকে বেশি মনোযোগ দিই। ফলে কখনো আমাদের সিনেমার নির্মাণভঙ্গি ইউরোপীয় হয়ে যায়, কখনো হলিউডি, আবার কখনো বলিউডি সিনেমার অনুকরণে চলে যায়। আমার কাছে মনে হয়, এই অনুকরণের প্রবণতাই আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট।”

নিজের নির্মাণভঙ্গিতে প্রভাব বিস্তারকারী নির্মাতাদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিভিন্ন নির্মাতার ছবি তো আমি দেখেছি—একেবারে ছোটবেলা থেকে, যখন সিনেমাটা বোঝার চেষ্টা করেছি। হয়তোবা মনোজগতে প্রভাব ফেলেছেন স্কুলে পড়ার সময় দেখা সত্যজিৎ রায়, পরবর্তী সময়ে আরেকটু বড় হয়ে ঋত্বিক ঘটক, তারপরে ইউনিভার্সিটিতে উঠে আরও অনেক ধরনের সিনেমা দেখা। অনেক ধরনের ফিল্মমেকার আছেন, যাঁদের ছবি এখনো দেখি। নতুন কিছু নামও যুক্ত হয়েছে, যাঁদের ছবি হয়তো দেখেছি কিংবা দেখছি। চায়নিজ ফিল্মমেকার ঝাং ইমু, তাঁর ছবি আমার ভালো লাগে। আসঘর ফরহাদির ছবিও ভালো লাগে, কিংবা নুরি বিলগে জিলান, কিম কি দুক, আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতু, ওং কার–ওয়াই, স্ট্যানলি কুবরিক, বং জুন হো—এ রকম আরও অনেকের নাম বলা যেতে পারে। তাঁদের বা অনেক অন্য ফিল্মমেকার আছেন, যাঁদের ছবি দেখার পর আমার মনোজগতে কোনো না কোনো ভাবনা তৈরি হয়েছে—এটুকু বলতে পারি। প্রভাব আছে কি না বলা খুব ডিফিকাল্ট, এটা মানুষ বলবে যে আমার সিনেমায় কিসের প্রভাব। আসলে গান, সিনেমা, পেইন্টিং—যা যা দেখি, সবকিছুরই প্রভাব আমার ছবিতে আছে। মানে সব প্রভাব নিয়েই আমার সিনেমা তৈরি হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।”

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক উৎসব দিয়ে আমাদের সিনেমার নিজস্ব ভাষা তৈরি হবে না কিংবা সিনেমার মানের কথা যদি বলি, সেটা তৈরি হবে না। আন্তর্জাতিক উৎসবে কিংবা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছানো তো আমাদের যেতেই হবে। সিনেমা তো সারা বিশ্বের কাছে যাওয়ারই গণমাধ্যম, কিন্তু আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সিনেমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ভাষা, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও গভীরভাবে আবিষ্কার করা। একটি চলচ্চিত্র যখন বিশ্বের কাছে যায়, তখন সেটি মূলত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হিসেবেই যায়। তাই তার ভেতরে আমাদের জাতিসত্তা, জীবনবোধ, দর্শন, চিন্তা, আধুনিকতা এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। গল্প শহরের হোক, মফস্‌সলের হোক কিংবা গ্রামের—সেটির ভেতরে এই ভূখণ্ডের মানুষ ও জীবনের ছাপ থাকতে হবে।”

দুর্বলতা ও শক্তির জায়গা নিয়ে তিনি বলেন, “দুর্বলতার কথা বলতে গেলে, আমার মনে হয় আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নিজেদের গল্পগুলো খুঁজে বের করার তাড়না হয়তো কম। এই জায়গাটাকেই আমি আমাদের অন্যতম বড় দুর্বলতা মনে করি। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারুণ্য। বাংলাদেশের সিনেমায় এখন অনেক নতুন নির্মাতা কাজ করছেন, এবং সামনে আরও অনেক নতুন নির্মাতা পাব বলে আমার বিশ্বাস করি। তাঁদের মধ্যে নতুনভাবে ভাবার সাহস আছে, সিনেমার ভাষা ও নির্মাণকৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ আছে, এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দিকেও তারা বেশ দক্ষ। এই শক্তিটাই ভবিষ্যতের বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।”

তিনি আরও বলেন, “আমার বিশ্বাস, এই দুই জায়গার সমন্বয় করতে পারলেই বাংলা সিনেমার একটি নতুন যাত্রা শুরু হবে। একদিকে যেমন আমাদের নির্মাতাদের মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দক্ষতা ও পারদর্শিতা তৈরি হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে গল্প, দর্শন ও জীবনবোধের ভেতর দিয়ে আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষাও খুঁজে বের করতে হবে। শুধু নির্মাণকৌশলে দক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; সেই দক্ষতার সঙ্গে নিজস্ব চিন্তা, সংস্কৃতি ও গল্প বলার ভঙ্গিরও সংযোগ ঘটতে হবে। যদি আমরা সেই ভাষা তৈরি করতে পারি, তাহলে বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছানো বা আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নেওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে। কারণ, একটি চলচ্চিত্রে যখন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভাষা খুঁজে পায়, তখন আন্তর্জাতিক পরিসরেও সেটি আলাদা হয়ে ওঠে। তাই আমি মনে করি না যে চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় উৎসবকে আলাদা করে মাথায় রাখার প্রয়োজন আছে। বরং নিজের গল্প, নিজের দর্শন এবং নিজের ভাষাকে খুঁজে পাওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ঘরানা নিয়ে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, একেকটা সিনেমা তো একেক রকম করে হয়। আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’ ছিল সমুদ্রযাত্রার গল্প, আর ‘রইদ’ মূলত দুই মানুষের সম্পর্ক ও জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। তৃতীয় ও চতুর্থ ছবি হয়তো আরেকটা প্রেক্ষাপটে তৈরি হবে এবং সেটা একই ধারাবাহিকতায় নিশ্চয়ই নয়। কারণ, প্রত্যেকটা ছবিতে তার নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে হয়—সেই জগতের গল্পটাই নির্মাতা হিসেবে আমার বলার ইচ্ছা।”

তিনি আরও বলেন, “তবে একজন নির্মাতা হিসেবে আমার আগ্রহের কিছু জায়গা আছে, যা হয়তো বারবার ফিরে আসবে। আমি যেসব বিষয় নিয়ে ভাবি, যেভাবে মানুষ ও জীবনকে দেখি, সেগুলোই আমার গল্প বলার ভেতরে প্রতিফলিত হবে। তবে সেটা সব সময় একই ধরনের আঙ্গিকে নয়। নতুন গল্পের প্রয়োজন হলে আমি আমার আগের চলচ্চিত্রের ধারা ভেঙেও অন্য পথে যেতে চাই। ভবিষ্যতে আমি প্রেমের গল্প বলতে পারি, সম্পর্কের অন্য জটিলতা নিয়ে কাজ করতে পারি, রাজনীতি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারি, এমনকি অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রও করতে পারি। গল্পের ধরন, প্রেক্ষাপট ও নির্মাণভঙ্গি বদলাতে পারে, কিন্তু আমার মনে হয় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসবে—মানুষের মনস্তত্ত্ব। তাই ভবিষ্যতে আমি কোন ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণ করব, সেটা এখনো খুব ভালো করে জানি না।”

নতুন কাজ নিয়ে তিনি জানান, “আরও দুটি গল্প নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছি। এর মধ্যে একটা গল্প হয়তো আমি ঠিক করে নেব। চিত্রনাট্যের কাজ শুরু হয়তো খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তারপর হয়তো শুটিং করব। লম্বা প্রসেস, আমি ওই প্রসেসের মধ্যে হয়তো নেক্সট ইয়ারে ঢুকব। আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’ ছিল সমুদ্রযাত্রার গল্প আর ‘রইদ’ মূলত দুজন মানুষের সম্পর্ক ও জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। তৃতীয় ও চতুর্থ ছবি হয়তো আরেকটা প্রেক্ষাপটে তৈরি হবে। কারণ, প্রতিটি ছবিতে তার নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে হয়, সেই জগতের গল্পটা নির্মাতা হিসেবে আমার বলার ইচ্ছা। আমি যেসব বিষয় নিয়ে ভাবি, যেভাবে মানুষ ও জীবনকে দেখি, সেগুলোই আমার গল্প বলার ভেতরে প্রতিফলিত হবে। তবে সেটা সব সময় একই ধরনের আঙ্গিকে নয়। নতুন গল্পের প্রয়োজন হলে আমি আমার আগের চলচ্চিত্রের ধারা ভেঙে অন্য পথেও যেতে চাই।”