একসময় ইবরার টিপুর জীবনে ছিল কণ্ঠ, সুর আর কাজের ব্যস্ততা। জনপ্রিয় এই সুরকার, সংগীত পরিচালক ও শিল্পীর সুরে গান গেয়েছেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা, সঙ্গে নিজেও প্রকাশ করেছেন একাধিক অ্যালবাম। তাঁর স্ত্রী বিন্দুকণাও দেশের পরিচিত সংগীতশিল্পী। রিয়েলিটি শো ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’ দিয়ে পেশাদার সংগীতাঙ্গনে পথচলা শুরু করা এই শিল্পী এক দশক ধরে গান করছেন। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে থাকেন এই দম্পতি।

জীবন তখন স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। বড় মেয়ে অর্নির স্কুল, স্বামী-স্ত্রীর সংগীতচর্চা আর প্রবাসজীবনের নিয়মিত কাজ—সব মিলিয়ে ব্যস্ততার মধ্যেই দিন কাটছিল। তবে ২০২৪ সালের শেষদিকে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পেটে অস্বস্তি ও পিঠে ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন ইবরার টিপু। স্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসকের কাছে যেতে হলেও শুরুতে বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেননি। কারণ, দেশে থাকাকালে তিনি দুই দশক ধরে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন। প্রতিবছর পুরো শরীরের চেকআপ করলেও বড় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর যে ফল আসে, তা তাঁর জীবনকে দ্রুত বদলে দেয়।

যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ইবরার টিপু জানতে পারেন, তিনি কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত এবং রোগটি ‘অ্যাডভান্স’ পর্যায়ে আছে। খবরটি শোনার পর তিনি হতবাক হন এবং দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিও তাঁর আস্থা কমে যায়। এর মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়—স্ত্রী বিন্দুকণা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বড় মেয়ে অর্নির বয়স ছয় বছর। প্রবাসজীবনের কারণে অনেক কাজ নিজেদের সামলাতে হচ্ছিল। তাই প্রথম দিকে তিনি ক্যানসারের বিষয়টি স্ত্রী ও পরিবারের কাছ থেকে গোপন রাখেন। তবে এক সময় তা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

বিন্দুকণা জানান, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর একপর্যায়ে চিকিৎসক সরাসরি বলেন, ইবরার টিপুর কিডনির ক্যানসারে আক্রান্ত এবং রোগটি ছড়িয়ে গেছে। চিকিৎসক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক মাসের বেশি সময় বাঁচবে না’। চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন কথা শোনার পর বিন্দুকণার ভাষায়, পুরো পরিস্থিতি থমকে যায়। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক বললেন, রোগের যে অবস্থা, টিপুর বাঁচার সম্ভাবনা কম। কথাটা শোনার পর আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম।’ পরে চিকিৎসকেরা জানান, পড়ে যাওয়ার কারণে গর্ভের সন্তানেরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। এরপর শুরু হয় অনিশ্চিত একটি সময়।

এ সময় স্বামী, স্কুলপড়ুয়া বড় মেয়ে এবং অনাগত সন্তান—সব মিলিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না বিন্দুকণা। তিনি বলেন, ‘সন্তান পেটে নিয়েই টিপুকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছি। কীভাবে চিকিৎসা করানো যায়, কার কাছে গেলে ভালো হবে—সেসব উপায় খুঁজেছি। পরে একজন চায়নিজ চিকিৎসকের সন্ধান পাই। তাঁর কাছ থেকে কিছুটা আশ্বাস পাই। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে।’

অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে সিদ্ধান্ত হয়, অস্ত্রোপচারের আগে ইবরার টিপুর কেমোথেরাপি শুরু হবে। ওই বছরের ২৬ মার্চ নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের কলম্বিয়া হাসপাতালে শুরু হয় তাঁর কেমোথেরাপি। টানা তিন দিন চিকিৎসা চলে। একই সময়ে ফ্লাশিংয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন অন্তঃসত্ত্বা বিন্দুকণা। ফলে একই শহরে দুই হাসপাতালে চলছিল দুই ধরনের লড়াই—একদিকে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ, অন্যদিকে সন্তানের অপেক্ষা।

এ বিষয়ে বিন্দুকণা বলেন, ‘এক হাসপাতালে টিপুর কেমোথেরাপি চলছে, অন্য হাসপাতালে আমি ভর্তি। সেই সময়টা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।’ তিন দিনের কেমোথেরাপি শেষে ইবরার টিপু বাসায় ফেরেন। একই দিন নবজাতক নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন বিন্দুকণাও। কিন্তু বাসায় ফিরে তিনি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যা এখনো ভুলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘বাসায় এসে দেখি, টিপু সোফায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। কাউকে চিনতে পারছে না। তিন দিনের নবজাতককে নিয়ে আমি বাসায় ফিরেছি। বড় মেয়েটা নিজের মতো কিছু রান্না করার চেষ্টা করছে। এসব দেখে আমি দিশাহারা। দ্রুত ৯১১-এ ফোন দিই। পরে অ্যাম্বুলেন্স টিপুকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

কেমোথেরাপি শুরু হওয়ার সময় ইবরার টিপুর ওজন ছিল ৭৬ কেজি। চিকিৎসার ধকল তাঁকে ভীষণভাবে ভেঙে দেয়। হাসপাতালে টানা ১৮ দিন ভর্তি থাকার সময় তাঁর ওজন কমে যায় প্রায় ২৫ কেজি; নেমে আসে ৫১ কেজিতে। বিন্দুকণা জানান, ‘ওই সময় পর্যন্ত সে আমাদের ছোট মেয়ের মুখও দেখেনি ইবরার। মাসখানেক পর প্রথমবারের মতো মেয়েকে কোলে নেয়।’

পাঁচ মাস ধরে কেমোথেরাপি চলে। পাশাপাশি দেওয়া হয় ইমিউনোথেরাপি। গত বছর থেকে প্রতি মাসে একটি করে ইমিউনোথেরাপি নিচ্ছেন টিপু। এ ছাড়া টার্গেটেড থেরাপি এবং প্রোটন থেরাপিও নিতে হয়েছে। কেবল কেমোথেরাপি নয়, অস্ত্রোপচারের কঠিন পথও পাড়ি দিতে হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইবরার টিপুর ১১ ঘণ্টা ধরে কিডনির ক্যানসারের জটিল অস্ত্রোপচার হয়। এর ঠিক এক মাস পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ফুসফুসের টিউমার অপসারণে সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এই দীর্ঘ সময়ে একাকিত্বই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়—এ কথা জানান বিন্দুকণা। তিনি বলেন, ‘নতুন একটা দেশ। আমি কাউকে সেভাবে চিনি না। যার ওপর ভরসা করে দেশটায় এসেছি, সেই মানুষটাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। দুই সন্তান নিয়ে কী করব, কীভাবে সামলাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শুধু আল্লাহকে বলতাম, আমাকে বাঁচিয়ে রেখো, যেন আমার মানুষটার পাশে থাকতে পারি।’

ইবরার টিপু ও বিন্দুকণা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে নিউইয়র্কের কুইন্স ভিলেজে থাকেন। এ বছরের অক্টোবরে বড় মেয়ে অর্নির বয়স আট বছর হতে চলেছে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় বিন্দুকণার সঙ্গে কথা বলার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন ইবরার টিপু। বড় মেয়েকে স্কুলে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পরে একটি কফিশপে থেমে কথা বলেন।

দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে ইবরার টিপু বলেন, ‘ওপরে আল্লাহ আর পাশে বিন্দুকণা ছিল বলেই আজ কথা বলতে পারছি। চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কথাও বলে শেষ করতে পারব না। জীবনের ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এখন ভাবলেও অবিশ্বাস্য লাগে।’

তবে কঠিন সময়ে কিছু মানুষের আচরণ তাঁর এবং পরিবারের জন্য কষ্টের কারণ হয়েছে বলেও জানান ইবরার টিপু। ‘ইউএসএতে আমাদের পরিচিত অনেক মানুষ আছেন। সহযোগিতা তো দূরের কথা, কেউ একবারের জন্যও দেখতে আসেনি। বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তারাও দেখা করেনি। এখন এসব নিয়ে আর ভাবি না।’ বললেন টিপু।

এরপর ইবরার টিপু বলেন, ‘আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই রোগ কাউকে না দেন। এটা কতটা কঠিন, সেটা কেবল আমরা জানি। একদিকে আমি হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিচ্ছি, অন্যদিকে আরেক হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা কণা ভর্তি। আমি চাইলেও তার পাশে থাকতে পারিনি। আবার বাসায় আমাদের ছোট্ট মেয়েটা একা ছিল। কীভাবে যে সময়টা কেটেছে, তা শুধু আল্লাহ জানেন।’

দীর্ঘ লড়াই শেষে এখন সুস্থতার পথে ইবরার টিপু। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। ধীরে ধীরে ওজনও বাড়ছে। খেতে পারছি। বাসার স্টুডিওতে কাজ করি। গাড়ি চালিয়ে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যাই।’