ফ্যান্টাসি অ্যানিমেশনের ইতিহাসে ‘অ্যাভাটার: দ্য লাস্ট এয়ারবেন্ডার’ একটি মাইলফলক। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল নিকেলোডিয়নে প্রথম সম্প্রচারিত হয় এই অ্যানিমেটেড সিরিজ। মানবিক গল্প আর দুর্দান্ত সব চরিত্র দ্রুতই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় সিরিজটি। সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যানিমেটেড টিভি সিরিজগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এটিকে।
এই জনপ্রিয়তাকেই পুঁজি করে ২০২৪ সালে একই নামের লাইভ-অ্যাকশন সিরিজ নিয়ে আসে নেটফ্লিক্স। বিশাল বাজেট ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ থাকলেও প্রথম মৌসুম দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পায়। দৃষ্টিনন্দন ভিজ্যুয়াল ও বড় পরিসরের নির্মাণ দর্শকদের মুগ্ধ করলেও সমালোচনাও কম ছিল না। কারণ, এই লাইভ সিরিজ মূল এনিমেটেড সিরিজের আবেগ বা চরিত্রের গভীরতা ঠিকমতো তুলে ধরতে পারেনি।
একনজরে.
সিরিজ: ‘অ্যাভাটার: দ্য লাস্ট এয়ারবেন্ডার ২’
ধরন: ফ্যান্টাসি, অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন
শোরানার: ক্রিস্টিন বয়লান, জাব্বার রাইসানি
অভিনয়: গর্ডন করমিয়ার, কিয়াওয়েন্তিও, ইয়ান ওসলি, ডালাস লিউ, মিয়া চেক, পল সান-হিউং লি, এলিজাবেথ ইউ
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
পর্ব: ৭টি
রানটাইম: ৫০–৮০ মিনিট
গত ২৫ জুন মুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় মৌসুম ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল বেশি। মুক্তির পরপরই সিরিজটি বিশ্বজুড়ে দর্শকদের নজর কাড়ে এবং নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল টপ ১০ ইংরেজি টিভি সিরিজের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। মাত্র চার দিনেই ভিউ হয় ৮০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। ১২ দিন পর সিরিজটির ভিউ ১ কোটি ৮৩ লাখ। বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যেও তুমুল আগ্রহ রয়েছে সিরিজটি নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে নেটফ্লিক্সে এখন সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজের একটি এটি। দর্শকের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে ‘অ্যাভাটার: দ্য লাস্ট এয়ারবেন্ডার ২’?
.প্রথম মৌসুমের শেষে নর্দার্ন ওয়াটার ট্রাইবকে রক্ষা করার পরও আংয়ের যাত্রা শেষ হয়নি। সে এয়ার (বাতাস) ও ওয়াটার (পানি) বেন্ডিং আয়ত্ত করলেও এখনো বাকি দুটি উপাদান আর্থ (মাটি) ও ফায়ার (আগুন) বেন্ডিং শেখা বাকি। তাই কাটারা ও সোকাকে সঙ্গে নিয়ে সে এবার বের হয় একজন আর্থবেন্ডিং শিক্ষকের খোঁজে। সেই পথেই তাদের দেখা হয় অন্ধ অথচ দুর্দান্ত প্রতিভাবান আর্থবেন্ডার টফ বেইফংয়ের সঙ্গে। আর্থবেন্ডিং শেখার পাশাপাশি তাঁরা পৌঁছে যায় আর্থ কিংডমের রাজধানী বা সিং সেতে।
বাইরে থেকে শান্ত ও নিরাপদ মনে হলেও বা সিং সে যেন রহস্য, ক্ষমতার রাজনীতি ও ষড়যন্ত্রে ঘেরা এক নগরী। যেখানে নিজেদের মানিয়ে নিতেই হিমশিম খায় তাঁরা। এদিকে বহু বছর পর আবার আকাশে দেখা দিয়েছে বিরল ধূমকেতু সোজিনস কমেট। এই ধূমকেতুর আগমনে ফায়ারবেন্ডারদের শক্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা পুরো বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
অন্যদিকে নির্বাসিত রাজপুত্র জুকো ও তার চাচা আইরোহ নিজেদের নতুন জীবনের সন্ধানে এগোতে থাকে। আর তাদের খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে ওঠে আজুলা। আজুলা কি ধরতে পারে জুকো এবং আংকে। নাকি সবাইকে নিয়ে যায় আরও গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে? এই ঘটনাই দেখানো হয়েছে এবারের সিজনে।
.এই মৌসুমে গল্পের পরিধি অনেক বড়। এ কারণেই অ্যানিমেটেড সিরিজের ভক্তদের কাছে ‘বুক টু: আর্থ’ সবচেয়ে প্রিয় অধ্যায়গুলোর একটি। এখান থেকেই গল্প ও চরিত্র—দুটিই নতুন মাত্রা পেতে শুরু করে। চরিত্রগুলো যেমন মানসিকভাবে আরও পরিণত হয়, তেমনি নিজেদের পরিচয়ও নতুনভাবে খুঁজে পেতে শুরু করে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, টফের আগমন এবং বা সিং সে–র রহস্যময় জগৎ গল্পকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়। ক্ষমতার রাজনীতি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি, গণহত্যার স্মৃতি এবং নেতৃত্বের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে সিরিজটিতে।
প্রথম মৌসুমের তুলনায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি এসেছে চরিত্রগুলোর উপস্থাপনায়। এবার সবাইকে অনেক সাবলীল ও চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অভিনয় করেছেন। আং (গর্ডন করমিয়ার)–এর বয়স বেড়েছে, তাই চেহারা ও কণ্ঠেও পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে বিষয়টি একটু চোখে লাগলেও খুব দ্রুত সেটি গল্পের অংশ হয়ে যায়। বরং এবার আংকে আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল মনে হয়।
.কাটারার (কিয়াওয়েন্তিও) নেতৃত্বগুণও চোখে পড়ার মতো। আর সোকা (ইয়ান ওসলি) ফিরে পেয়েছে তার চেনা হাস্যরস। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন জুকো (ডালাস লিউ)। নিজের পরিচয় আর জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার লড়াইয়ে ডালাস লিউ দারুণ অভিনয় করেছেন। নিজের ভুল বুঝে বদলে যাওয়ার এই ‘রিডেম্পশন আর্ক’(আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তনের যাত্রা) আধুনিক ফ্যান্টাসির অন্যতম সেরা চরিত্র বিকাশ হিসেবে বিবেচিত। আইরোহ (পল সান-হিউং লি)–এর সঙ্গে তার সম্পর্কের দৃশ্যগুলোকে এই সিজনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত বললে ভুল বলা হবে না।
.সেই বিতর্কিত শো থেকে দক্ষিণি সিনেমা, নেটফ্লিক্সে কী দেখছেন বাংলাদেশের দর্শকেরা.নতুন মৌসুমের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্য টফ বেইফং (মিয়া চেক)। অ্যানিমেটেড সিরিজের ভক্তদের কাছে টফ অন্যতম প্রিয় চরিত্র। তাই তাকে লাইভ-অ্যাকশনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সহজ ছিল না। কিন্তু মিয়া চেক আত্মবিশ্বাস, তীক্ষ্ণ রসবোধ ও একরোখা ব্যক্তিত্ব দিয়ে প্রথমেই চরিত্রটিকে নিজের করে নিয়েছেন। টফ যোগ দেওয়ার পর আং, কাটারা ও সোকার দলটিও সত্যিকারের একটি পরিবারের রূপ পায়, যা পুরো সিজনের আবেগকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
প্রথম মৌসুমের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—নেটফ্লিক্সের এই লাইভ-অ্যাকশন সিরিজ মূল অ্যানিমেটেড সংস্করণের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে পারবে কি না। প্রযোজনার দিক থেকে দ্বিতীয় সিজনটি প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। পোশাক, সেট, লোকেশন ও ভিজ্যুয়াল ডিজাইনে নির্মাতাদের যত্ন স্পষ্ট।
.বিশেষ করে বা সিং সে শহরটির বিশালতা ও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক পরিবেশ দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেন্ডিংয়ের লড়াইগুলোও এবার আরও গতিময় ও আকর্ষণীয়। আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস—চারটি উপাদানের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। তবে ভিএফএক্স সব সময় একই মান ধরে রাখতে পারেনি। কিছু দৃশ্য চোখধাঁধানো হলেও, কয়েকটি মুহূর্তে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কৃত্রিমতা স্পষ্ট চোখে পড়ে।
.কী আছে ভারতের নিষিদ্ধ এই সিনেমায়.এই মৌসুমের সবচেয়ে বড় অর্জন অন্য জায়গায়। লাইভ-অ্যাকশন সিরিজটি এবার আর অ্যানিমেটেড সংস্করণকে হুবহু অনুসরণ করার চেষ্টা করেনি। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী গল্পে পরিবর্তন এনেছে, কিছু চরিত্রকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে এবং নিজের মতো করে গল্প বলার চেষ্টা করেছে। সব সিদ্ধান্ত সমানভাবে সফল না হলেও, এই আত্মবিশ্বাসই সিরিজটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করেছে। অ্যানিমেটেড সিরিজের প্রতিটি পর্ব আলাদা আলাদা অভিযানের ওপর দাঁড়ানো ছিল। লাইভ-অ্যাকশনে নির্মাতারা সেগুলোকে একটি ধারাবাহিক গল্পে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তবে এই বিস্তৃত কাহিনিই নতুন মৌসুমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও বটে। গল্পের গতি মাঝে মাঝে অতিরিক্ত দ্রুত, কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ঘটনাকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ গল্প সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে অনেক আবেগঘন মুহূর্ত কিংবা চরিত্রগুলোর পরিবর্তনের যাত্রা পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। আরও একটি বা দুটি পর্ব থাকলে গল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আরও স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেত। তবু শক্তিশালী চিত্রনাট্য, দুর্দান্ত অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি, পরিণত অভিনয় ও টফ বেইফংয়ের সফল অভিষেক এই মৌসুমকে আগের কিস্তিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এখন বাকি তৃতীয় তথা শেষ কিস্তি। সেটা যদি ভালো হয় তাহলে সিরিজটিকে আরও এক ধাপ ‘অ্যাভাটার: দ্য লাস্ট এয়ারবেন্ডার’–এর নেটফ্লিক্স অ্যাডাপ্টেশন উতরে যাবে।






