ফার্মের মুরগির লালন-পালনের উপমা কিংবা ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে অনেকেই শহরে আমাদের শিশুদের বেড়ে ওঠার আধুনিক পরিক্রমাকে অনেক সময় ফার্মের লালন-পালনের সঙ্গে তুলনা করে। ঠিক এই রকম এক ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার করে বিপাকে পড়েছেন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী।
চলমান এইচএসসি শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে এক ব্যক্তিগত ফোনালাপে ‘ফার্মের মুরগির’ সঙ্গে তুলনা করার অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নামে ঠিক দুই বছর আগে কোটা আন্দোলনে ‘তুমি কে আমি কে/ রাজাকার রাজাকার/কে বলেছে কে বলেছে/স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ আদলে স্লোগান দেয় ‘তুমি কে, আমি কে/ ফার্মের মুরগি’,‘কে বলেছে, কে বলেছে/ শিক্ষামন্ত্রী’।
শিক্ষামন্ত্রীর কণ্ঠের মতোই শোনা যায়, ‘আমি এভাবে মিটিংয়ে বলতেছিলাম যে এরা (এইচএসসি পরীক্ষার্থী) তো ফার্মের মুরগি, মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে। আমার মেয়েরও তা–ই হয়। তো আমি বললাম যে দৌড়-লাফঝাঁপ দিয়ে পরীক্ষা দিতে যাবে, বৃষ্টির মধ্যে মাথায় পানি পড়বে, পরের দিন ঠিকঠাক পরীক্ষা দিতে পারবে না।’
.বেসামাল শিক্ষা—পথে ফেরার উপায় কী.যেহেতু শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর বচনের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন, তাই ধরে নেওয়া যায় অডিও ক্লিপে বলা বক্তব্য তাঁর নিজেরই। যদিও ফার্মের মুরগির আলাপটি করতে আমার একধরনের অস্বস্তি আছে, তবে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ‘ফার্মের মুরগির’ আলাপটা একটু চালিয়ে যেতে চাই, যাতে করে ফার্মের মুরগির ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার কমে।
দেখুন, শিক্ষামন্ত্রী যে ভাষায় ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দ দুটি প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন, তার অর্থ আমি যদি বুঝে থাকি, তাহলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শিক্ষার্থীরা হবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী, তারা সামান্য বৃষ্টির পানিতে কেন অসুস্থ হবে, তা নিয়ে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষামন্ত্রী কিংবা আমরা যে সময় স্কুল ও কলেজ পার করেছি, সেই সময়ের শিক্ষার আনুষঙ্গিক পরিবেশ আর এখনকার পরিবেশের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। একটা সময় শিক্ষার্থীরা স্কুল কিংবা কলেজে গেলে ক্লাসের পর খেলাধুলা কিংবা শারীরিক ব্যায়ামের যে সুযোগ পেত, তা এখন কমে গেছে কিংবা হয় না।
.যে মা–বাবা মনে করছেন, তাঁর সন্তানদের প্রধান কাজ খাওয়াদাওয়া আর পড়াশোনা করা, সেই সব বাবা-মায়ের ঘুম না ভাঙাতে পারলে ‘ফার্মের মুরগির’ উপমা সহজে কাটবে না। এই মুরগীকরণ এক দিনে হয়নি, দিনের পর দিন আমাদের শিশুদের কৈশোর-শৈশব কেড়ে নিয়েছে আমাদের পাঠ্যপুস্তুক আর জিপিএ নামের এক ঘোড়া। যে রেসে ছেড়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।.
এই যে খেলাধুলা করার জন্য যে মাঠের প্রয়োজন, শারীরিক ব্যায়ামের জন্য যে জায়গা প্রয়োজন, সেই জায়গা দখল করেছে বড় বড় অট্টলিকা। শহরের স্কুল-কলেজগুলোর দিকে তাকান, দেখবেন স্কুল বলতে একটা ব্লিডিং, আর সেই ঘরে রয়েছে বেঞ্চ-চেয়ার। এর বাইরে কোনো পরিবেশ আপনি পাবেন না। শিক্ষার্থীরা সকালে চোখ ঘঁষতে ঘঁষতে ক্লাসে আসে, ক্লাস শেষ করে দুপুর কিংবা বিকেলে বাসায় যায়, এরপর খাওয়াদাওয়া শেষ করে প্রাইভেট-কোচিং করতে চলে যায়। সন্ধ্যায় ফিরে পড়ার টেবিলে কাটে মধ্যরাত অবধি।
শহরের মতোই একই ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। জিপিএ–এর পেছনে ছুটছে শিক্ষার্থীরা, ছুটছেন তাদের অভিভাবক। আর সেই জিপিএ ভেলকি দেখিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বছরের পর বছর ধরে চলছে এই প্রতিযোগিতা। অনেকটাই কম সময়ে কম খরচে কীভাবে মুরগির বেশি মাংস পাওয়া যাবে, সেই কৌশলই কাজে লাগাচ্ছে শিক্ষা–সংশ্লিষ্টরা।
.কম পড়ে বেশি ফল কীভাবে পাওয়া যাবে, কিংবা ফটোকপি পড়ে কীভাবে জিপিএ–তে ভালো করা যাবে, সেই নেশায় আক্রান্ত হয়েছে আমাদের কোমলমতিরা। সেই নেশার খোড়াক জোগাচ্ছেন আমাদের অভিভাবক ও শিক্ষকেরা। এই যে সমানুপাতিক সম্পর্কে শিক্ষার যে হাল, তাঁর কারিগর আবার আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খামারিদের মতো তারাও এমন পাঠ্যপুস্তক, সিলেবাস আর পড়াশোনার মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে, যা থেকে কোনো শিক্ষার্থী বের হয়ে খেলাধুলা কিংবা শারীরিক ব্যায়াম করবে, তার ফুরসত হয়ে উঠছে না।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, ফার্মের মুরগির খামারিদের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি আমাদের এভাবে শিক্ষার রথ চালিয়ে যাবে? পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যে আলাদা জগৎ আছে, সেই জগৎকে চেনানোর জন্য যেসব সরঞ্জাম প্রয়োজন, তার জোগাড় কী আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিতে পারবে? আমাদের শিক্ষাক্রম কী পারবে, আমাদের সন্তানদের নিজেদের জগৎ সম্পর্কে পরিচিত করতে, তারা কী পারবে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে? যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ নেওয়ার জন্য নয়, নিজেদের গড়তে, দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
.বাংলাদেশের 'ইনস্ট্যান্ট' জেনারেশন ও প্রশ্নফাঁস.যদি সেই পরিবেশ সৃষ্টি না করতে পারে, তাহলে ফার্মের মুরগি লালন-পালনের দায়ভার অবশ্যই শিক্ষামন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাঁধে গিয়ে বর্তায়। মনে রাখতে হবে, ভালো চালক হতে হলে, ভালো গাড়িও প্রয়োজন, তাহলে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া যায়। সেটা না করে, কেবল গতানুগতিক প্রশ্নপত্র, পরীক্ষা, ক্লাসে নিমজ্জিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনি বড় স্বপ্ন দেখতে পারবেন না। স্বপ্ন দেখার আগে মাইয়োপিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যাবেন। ঠিক যেমন শিক্ষামন্ত্রীও হয়েছেন।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, অর্থাৎ এক্সটা কারিকুলাম অ্যাকটিভিটিজের সুযোগ না তৈরি করে, আপনি শিশুদের বৃষ্টির পানিতে ভিজতে বলবেন, হাঁটুপানি ভেঙে এসে পরীক্ষা দিতে বলবেন, তা কী করে সম্ভব বলুন? যে স্কুলে খেলার মাঠই নেই, সেই স্কুলের শিশুদের মধ্যে থেকে আপনি উসাইন বোল্ট প্রত্যাশা করেন কীভাবে?
যে মা–বাবা মনে করছেন, তাঁর সন্তানদের প্রধান কাজ খাওয়াদাওয়া আর পড়াশোনা করা, সেই সব বাবা-মায়ের ঘুম না ভাঙাতে পারলে ‘ফার্মের মুরগির’ উপমা সহজে কাটবে না। এই মুরগীকরণ এক দিনে হয়নি, দিনের পর দিন আমাদের শিশুদের কৈশোর-শৈশব কেড়ে নিয়েছে আমাদের পাঠ্যপুস্তুক আর জিপিএ নামের এক ঘোড়া। যে রেসে ছেড়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
.শিশুর ওজনের চেয়ে বইয়ের ব্যাগের ভার বেশি জানার পরও বাবা-মায়েরা দিনের পর দিন সেই ব্যাগ শিশুদের দিয়ে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের কাঁধের ব্যথা অনুভব করতে না পারছেন তাদের অভিভাবক, না পারছেন আমাদের শিক্ষার খামারিরা। ফলে এই ধরনের রোগ-প্রতিরোধহীন প্রজন্মই এই জাতির দায়িত্ব নিচ্ছে, রোগ হলে সাড়াচ্ছে বিদেশিদের দিয়ে। বিদেশি ডাক্তার, বিদেশি প্রকৌশলীদের ড্রয়িংয়ে হচ্ছে এই দেশের রাস্তা-ব্রিজ-সেতু আর ভবন।
এই রোগ বোঝার সক্ষমতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের থাকা চাই, শিক্ষা–সংশ্লিষ্টদের থাকা চাই। সেটা না করতে পারলে, ফার্মের মুরগি থেকে হবেন আগামীর কোনো শিক্ষামন্ত্রী, হবেন চিকিৎসক, হবেন প্রকৌশলী, হবেন সংসদ সদস্য , হবেন সাংবাদিক। হয়তো এভাবেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিজেদের তুলে ধরার সক্ষমতা হারানো প্রজন্মের কাঁধে যাবে আগামীর বাংলাদেশ, যার প্রবেশমুখে দাঁড়িয়েছি আমরা।
নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব






