গাজায় ইসরায়েলের চালানো বিধ্বংসী সামরিক অভিযান ইতিমধ্যেই হাজার দিনের সীমা অতিক্রম করেছে। গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে থামেনি মৃত্যু আর ধ্বংসলীলা।
এই দীর্ঘ সংঘাতের ফলে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি শিশু। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন সাংবাদিকরাও; ইসরায়েলি হামলায় দুই শতাধিক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ইসরায়েল গাজার আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করলেও বিশ্বের মনোযোগ এখন গাজা থেকে সরে গেছে। বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এবং সম্ভাব্য সমঝোতা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও গাজা প্রসঙ্গ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় শান্তি পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হামাস নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা ঘোষণা করেছে যে, গাজায় তাদের দীর্ঘ দুই দশকের প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই নতুন সংস্থার নাম 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা' (এনসিএজি)। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই অন্তর্বর্তী কমিটি গঠিত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি 'বোর্ড অব পিস' নামক একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।
ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ছিল ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা। তবে বাস্তবে এর কোনোটিই কার্যকর হয়নি। এনসিএজি কোনো সম্পদ বা সহায়তা পায়নি এবং ইসরায়েল তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় তারা এখনো কায়রোয় অবস্থান করছে। পাশাপাশি বোর্ড অব পিস নিষ্ক্রিয় এবং তাদের তহবিলে কোনো অর্থ নেই।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বোর্ড অব পিস ঘোষণা করেছে যে গাজায় রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনরার আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তকে শরণার্থী সমস্যা মুছে ফেলার চেষ্টা হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ গাজায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত মানবিক অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনাকে অনেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী এবং জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তরের শামিল বলে মনে করছেন।
হামাস মনে করে, শাসনক্ষমতা ছাড়লে ইসরায়েল তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হারাবে। এর মাধ্যমে তারা ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করে শান্তিপ্রক্রিয়া সচল করতে চায়। তবে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘোষণাকে ‘চালাকি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন যে নিরস্ত্রীকরণ এড়াতেই হামাস এই কৌশল নিয়েছে। বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, গাজার সব অস্ত্র এনসিএজির নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কিন্তু হামাসের অবস্থান স্পষ্ট—ইসরায়েল যদি গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যায় এবং দখলদারি শেষ করে, তবেই তারা অস্ত্র ছাড়ার কথা ভাববে।
বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেনাবাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ দখলের নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’গুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা থাকবে।
আলি শাথের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের টেকনোক্র্যাট কমিটিকে গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হলে তারা দায়িত্ব নিতে পারত, কিন্তু ইসরায়েল সেই পথ বন্ধ করে রেখেছে। কায়রোতে হামাস, অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, বোর্ড অব পিস এবং কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের বৈঠক হলেও অচলাবস্থা কাটেনি।
পুরো পরিস্থিতি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ এখন ইরান সংকটের দিকে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ইরানি তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল করেছে। ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ বলে জানালেও আলোচনার দরজা খোলা রেখেছেন।
"যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ট্রাম্পের অস্থিরতা, খামেনির অন্ত্যেষ্টির পর ইরানের কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে গাজার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর ফেরার সম্ভাবনা কমছে।"
প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ প্রয়োগ করবে। গাজায় হামলা, ত্রাণ বাধা এবং নতুন এলাকা দখল নিয়ে ওয়াশিংটন নীরব থাকলেও তারা বারবার হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে দখলদারি এবং জাতিগত নিধনের বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই। আসন্ন নির্বাচনের মুখে জনসমর্থন কমায় নেতানিয়াহু শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণে অনিচ্ছুক। ফলে গাজার শান্তি পরিকল্পনার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে এবং ফিলিস্তিনিরা আবারও মৃত্যু ও ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
(মালিহা লোধি: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত। ডন থেকে সংগৃহীত; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।)






