গত ২১ জুন কারেন রাজ্যের হপাপুন শহরতলির পাহাড়ি এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। সেখানে জান্তার ১৯ নম্বর লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার মেজর কিয়াও মিন থান্ট নিহত হন। তাঁকে হত্যা করেন তাঁর নিজেরই বডিগার্ড। এই বডিগার্ডকে তিনি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন, যিনি বাগো অঞ্চলের একজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। মাত্র পাঁচ মাস আগে তাঁকে বাড়ি থেকে জোর করে তুলে এনে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে ওই বডিগার্ডসহ ২২ জন জোরপূর্বক নিয়োগ পাওয়া সেনা দলত্যাগ করে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দলত্যাগীদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সেনা, যাঁদের আগে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই ঘটনা জান্তার বিতর্কিত সামরিক নিয়োগ নীতির আসল রূপ প্রকাশ করে। বড় ধরনের পরাজয়ের পর এই নীতির মাধ্যমে জান্তা বাহিনীতে লোকবল বাড়িয়েছিল তারা। সাময়িকভাবে মনে হয়েছিল জান্তা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে, তবে আড়াই বছর পর এখন তাদের সেই পথ বন্ধ হয়ে আসছে।

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের বলা হচ্ছে যে জান্তা সরকার পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল’ করেছে। তবে জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা নির্বাচন-পরবর্তী স্বীকৃতির কথা ভাবার আগে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত চিত্রটি ভালো করে দেখা উচিত। দেশের অর্ধেকের বেশি টাউনশিপের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তাতমাদো (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালের নিষ্ক্রিয় ‘পিপলস মিলিটারি সার্ভিস ল’ সচল করে। এর পর থেকে ২৫টি ধাপে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই জোরপূর্বক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষকে, যা ২০২০ সালের নিয়োগের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। ‘আনলফুল কনস্ক্রিপশন ওয়াচ’ ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে ৩২ হাজার ৯৭৪টি জোরপূর্বক নিয়োগের ঘটনা নিশ্চিত করেছে।

এই জোরপূর্বক নিয়োগ জান্তাকে কিছুটা সময় দিয়েছিল। এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং ফালাম, লাশীয় ও মায়াবতীর মতো প্রায় ২০টি শহর পুনর্দখল করেন এবং হপাপুন ও কিয়াকফিউতে সেনা পাঠাতে সক্ষম হন। ড্রোন ইউনিট, প্যারাট্রুপার ও জাইরোকপ্টার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সামরিক শক্তিও কিছুটা বেড়েছিল। তবে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিরোধযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল প্রায় ৮৭টি শহর। জান্তার তথাকথিত ‘পুনর্দখল’ করা বেশির ভাগ শহরই কেবল প্রচারণার জন্য; তারা কেবল শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি ব্যারাকে সেনা মোতায়েন করে ছবি তোলে, আর প্রতিরোধযোদ্ধারা আশপাশের গ্রামগুলোতে নতুন করে সংগঠিত হয়।

২০২৪ সালের ওই আইনে নিয়োগের মেয়াদ ছিল দুই বছর। প্রথম ব্যাচের মেয়াদ এখন শেষ। নতুনদের মধ্যে অসন্তোষ এড়াতে জান্তা কিছু সেনাকে ঘরে ফেরার অনুমতি দিলেও ‘জরুরি’ ধারা ব্যবহার করে এই মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে। যুদ্ধে নিহত, নিখোঁজ ও দলত্যাগীদের হিসাব বাদ দিলে নিয়োগপ্রাপ্তদের অর্ধেকও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি; আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জান্তা নতুন রিক্রুটদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যের অবরুদ্ধ কিয়াকফিউ নৌঘাঁটিতে শত শত নতুন রিক্রুট পাঠানো হলেও তারা আরাকান আর্মির অবরোধ ভাঙতে পারেনি, বরং দ্রুত হতাহত হচ্ছে বা দলত্যাগ করছে।

কারেন ফ্রন্টের প্রতিরোধযোদ্ধারা জানান, জান্তা বাহিনীকে তাদের নিহত নতুন সেনাদের লাশ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে প্রায়ই যুদ্ধ থামাতে হয়। দলত্যাগ এবং পলায়ন এখন জান্তা বাহিনীর নিয়মিত চিত্র। হপাপুনের যে সেনা তাঁর কমান্ডারকে হত্যা করেছিলেন, তিনি সেনানিবাস ছাড়ার পর থেকেই এই পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথমে কমান্ডারের বিশ্বাস অর্জন করে বডিগার্ড হন এবং এরপর একযোগে ২২ জনকে নিয়ে দলত্যাগ করেন। এমন ঘটনা এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঘটছে। প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাজ এখন শুধু যুদ্ধ করা নয়, বরং দলত্যাগ করে আসা জান্তা সেনাদের আশ্রয় দেওয়াও বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইয়াঙ্গুন ছাড়া মিয়ানমারের প্রতিটি রাজ্য ও অঞ্চলে জান্তা এখন একযোগে যুদ্ধ করছে এবং প্রতিটি ফ্রন্টেই ব্যাপক জনবল হারাচ্ছে। আরাকানে ১৮ মাসের অভিযানে জান্তা প্রায় কিছুই অর্জন করতে পারেনি। আরাকান আর্মি এখন সিতওয়ে ও কিয়াকফিউর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং তাদের সহযোগী বাহিনীগুলো আইয়ারওয়াদি, বাগো এবং মাগওয়ে অঞ্চলে প্রবেশ করছে। চিন রাজ্যে হাখা থেকে কানপেটলেট ও মিনদাত অভিমুখী অভিযান থমকে গেছে। কাচিনে শোয়েগু অভিমুখে রিজিওনাল মিলিটারি কমান্ড-৪-এর অভিযান প্রতিরোধের মুখে ভেঙে পড়েছে এবং ওই কমান্ডের প্রধান আহত হয়ে ফিরে গেছেন।

সাগাইংয়ে প্রতিরোধযোদ্ধাদের হামলার কারণে জান্তার প্রধান সরবরাহ পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কারেন রাজ্যে অবরুদ্ধ ওয়া লে কোনে ঘাঁটিতে সাহায্য পাঠাতে গিয়ে তীব্র লড়াইয়ের মুখে পড়েছে জান্তা বাহিনী। কারেনি রাজ্যে জান্তা কেবল কয়েকটি শহরের কেন্দ্রে অবরুদ্ধ এবং তানিনথারিতেও তাদের উপস্থিতি খুবই দুর্বল।

"মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা এখন ১৯৬২ সালের পর সবচেয়ে কম এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সেনাবাহিনীতে এখন নিজেদের সেনারাই কর্মকর্তাদের হত্যা করছে। তাদের পুরো সামরিক কাঠামো এখন অতিরিক্ত কোনো রিজার্ভ ফোর্স ছাড়াই ফ্রন্টলাইনে লড়াই করছে।"

তাতমাদোর ১০টি লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের (এলআইডি) সবকটিই এখন বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত, কোনো রিজার্ভ ফোর্স নেই। ২০টি রিজিওনাল মিলিটারি কমান্ডের (আরএমসি) মধ্যে ১৫টি সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। আরএমসি-১৬ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় লাশিয়োতে তা নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, আর আরএমসি ৫, ৯ এবং ১৫ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যা পুনর্গঠন করা আর সম্ভব নয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সংগৃহীত নতুন সেনা এখন শেষ পর্যায়ে এবং প্রতিরোধযোদ্ধারা এখন পুরো কলাম গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

বামার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সামাজিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। মান্দালয়ের আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যে জান্তার নিয়োগকারী দলকে ‘মানব পাচারকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইয়াঙ্গুনের পরিবারগুলো রাতের তল্লাশি এড়াতে সন্ধ্যা সাতটার পর বাইরে বের হয় না এবং সেনাবাহিনীতে যাওয়া এড়াতে ঘুষের একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। দক্ষ কর্মশক্তি দেশ ছাড়ছে। আইওএম জানিয়েছে, থাইল্যান্ডেই ২৩ লাখ নিবন্ধিত মিয়ানমারের অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন, অনিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা এর চেয়েও দ্বিগুণ। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, প্রতি চারজন তরুণের মধ্যে তিনজন পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণে না থাকায় উৎপাদনশীলতা ও পারিবারিক আয়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সীমান্ত সংকটের মূল কারণ জান্তার নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেই নিহিত, যেখানে মাদক চোরাচালান, অনলাইন স্ক্যাম ও মানব পাচারের মতো অপরাধ ঘটছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাকে (আইএলও) জানিয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক নিয়োগ এবং ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ নাগরিকদের পাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকিতে ফেলছে। থাইল্যান্ড এখন ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষদের ফেরত পাঠাতে সতর্ক, কারণ জান্তা তাদের সরাসরি সেনাবাহিনীতে নিয়ে যাচ্ছে।

বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সরাসরি হামলা চালাচ্ছে জান্তা, তাই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। ওএইচসিএইচআর-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আশপাশের ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার প্রধান কারণ বিমান হামলা। জান্তার বিমান জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিরোধযোদ্ধাদের সরাসরি সহায়তার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে হবে।

এই পরিস্থিতি থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট: প্রথমত, জান্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এই অজুহাতে তাদের কোনো স্বীকৃতি বা রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, জান্তার আর্থিক উৎস, বিমান জ্বালানি ও অস্ত্র সরবরাহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, এনইউজি, জাতিগত প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও দলত্যাগীদের পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ায় সরাসরি সহায়তা করতে হবে। ফেডারেল-গণতান্ত্রিক মিয়ানমার এখন বর্তমানের বাস্তব রূপ, যা গড়ে তুলছে দেশটির সাধারণ মানুষ।