গত ঈদুল ফিতরের রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, দায়িত্বহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, দায়িত্বে নিয়োজিত দুই গেটম্যান কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে অর্থের বিনিময়ে অন্য দুজনের সঙ্গে দায়িত্ব বদল করেছিলেন। অন্যদিকে, যারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তারা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফলে ট্রেন আসার সময় ব্যারিয়ার নামেনি এবং যাত্রীবাহী বাস রেললাইনে উঠে যাওয়ায় মুহূর্তেই ঘটে যায় ভয়াবহ বিপর্যয়।

কুমিল্লার এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। গত এক বছরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, নরসিংদী, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লেভেল ক্রসিংয়ে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও গেটম্যানের অনুপস্থিতি, কোথাও নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব, আবার কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ভুলে দুর্ঘটনা ঘটছে। সমস্যার ধরন ভিন্ন হলেও মূল সংকটটি একই—অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩ হাজার ২৮৬টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ১৪৪টি, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশই সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এসব ক্রসিংয়ে গেটম্যান, প্রতিবন্ধক কিংবা সতর্কবার্তাসংবলিত সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই। অরক্ষিত ক্রসিংগুলোর একটি বড় অংশ অনুমোদনহীন এবং স্থানীয় সরকার বা অন্যান্য সংস্থা রেলের অনুমতি ছাড়াই এসব সড়ক নির্মাণ করেছে। তবে প্রশাসনিক বিরোধ বা মালিকানার প্রশ্নে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে রাখা যায় না। যে সড়ক মানুষ ব্যবহার করছে, তা নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৫ সালে লেভেল ক্রসিং উন্নয়নে দুটি প্রকল্পে ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। গেটম্যান নিয়োগ, গুমটিঘর নির্মাণ ও প্রতিবন্ধক স্থাপনের কাজ করা হলেও গেটম্যানের অনুপস্থিতি ও অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এটি প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জবাবদিহিতা, নিয়মিত তদারকি এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ।

বিশ্বের অনেক দেশে লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর। ট্র্যাক সার্কিট বা এক্সেল কাউন্টারের মাধ্যমে ট্রেন আসার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যারিয়ার নেমে যায় এবং সতর্কসংকেত চালু হয়। বাংলাদেশে সীমিত আকারে এমন ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ ক্রসিং এখনো মানুষের ওপর নির্ভরশীল, যা ভুলের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রস্তাবিত রেডিও ওয়ার্নিং ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রযুক্তি গ্রহণের সিদ্ধান্ত যেন কেবল দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে প্রায়ই পরিকল্পনা ও ব্যয় বাড়লেও বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন বিলাসিতার সুযোগ নেই, কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানেই নতুন দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কঠোর হওয়া জরুরি। দায়িত্ব বদলের মতো অনিয়ম কীভাবে বছরের পর বছর চলতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। গেটম্যানদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং অবহেলার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রেল, সড়ক, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অরক্ষিত ক্রসিংগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।