ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই তারেক রহমান বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার একাংশ অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নীতিগত, আবার কিছু নিছক লোকপ্রিয়তা অর্জনের জন্য করা 'পারফরম্যাটিভ' পদক্ষেপ। যেমন—অফিসে যাওয়ার পথে ধানের শিষ হাতে থাকা গার্ডের কাছে উপহার পাঠানো, বিলবোর্ডে নিজের বা পরিবারের ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে সেলফি তোলা। এসব পদক্ষেপ নীতিগত না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।
এছাড়া একাধিক রাজনৈতিক সভায় সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলোও মানুষ পছন্দ করেছে। পাশাপাশি অভাবী মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারির মতো কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তও নজরে এসেছে। প্রথম বিদেশ সফরে ভারত এড়িয়ে মালয়েশিয়া ও চীনে যাওয়া সিদ্ধান্তটি অনেক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে কম আলোচিত হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হলো জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের নিয়োগ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একজন নিকটাত্মীয় হলেও তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আইরিন খান আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব এবং পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল ফার্মের প্রধান হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন।
এক দশক আগে জাতিসংঘে তাঁর এক ঘণ্টার দীর্ঘ ভাষণ শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। ২০২০ সালে যখন তাঁকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক বা র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন বিশ্বের ১২টি আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের দায়িত্বপ্রাপ্তিতে বাক্স্বাধীনতা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর জবাবদিহি বাড়বে।
"অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অথবা তারেক রহমানের নতুন সরকারের সময়, অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে, সে কথাও কেউ বলেনি। মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার নিয়ে যখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে একজন প্রকৃত মানবাধিকারকর্মীকে জাতিসংঘে তার স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে তারেক রহমান সরকার সাহসের পরিচয় দিয়েছে।"
এই নিয়োগের ফলে কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা বা 'ভিজিবিলিটি' বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্ব মিডিয়া আগে আইরিন খানের ব্যক্তিগত বক্তব্য আগ্রহ নিয়ে শুনত, এখন তিনি যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলবেন, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আরও বেশি আকৃষ্ট হবে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম অবনতি, গুম-খুন, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং ২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবের সময় গণহারে হত্যার মতো ঘটনাগুলো জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বর্তমান সরকারের সময়েও পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে একজন প্রকৃত মানবাধিকারকর্মীকে স্থায়ী প্রতিনিধি করা সরকারের একটি সাহসী পদক্ষেপ।
অ্যামনেস্টির মহাসচিব থাকাকালীন আইরিন খান বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং র্যাবের মাধ্যমে পরিচালিত গুম-খুনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য র্যাব ও সেনাবাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এমনকি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণের প্রশ্নে তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টার পত্রিকার ওপর মব হামলার পর তিনি বলেছিলেন, ‘এই মব আক্রমণগুলো হাওয়া থেকে ঘটেনি, বরং বিচারহীনতা দূর করা এবং সংবাদমাধ্যম ও শিল্প-সাহিত্যের স্বাধীনতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণেই এগুলো ঘটেছে।’
এখন প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার বাইরে থেকে একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন, সরকারের প্রতিনিধি হিসেবেও কি তা বলতে পারবেন? এটাই হবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার আসল পরীক্ষা। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে আসা সাইবার সুরক্ষা আইনের অপব্যবহার এবং বাক্স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি কীভাবে কথা বলেন, তা দেখার বিষয়।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিহার্য।
পাশাপাশি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া একটি বাড়তি সম্মান। এই সময়ে আইরিন খানের মতো একজন মানবাধিকার নেত্রীর স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ বাংলাদেশের জন্য এক তুলনহীন দৃশ্যমানতার সুযোগ তৈরি করবে।






