মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বর্তমানে গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। মাইক্রোসফটের কাজ থেকে অবসর নিলেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন-সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন তিনি। স্বাস্থ্য–শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে কাজ করা বিল গেটস ১২ জুলাই পেশাজীবীদের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে এইডস-মুক্ত প্রজন্মের বিষয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন। পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
২০০৭ সালের কথা। ওয়েন্ডো আসেদ তখন বিশের কোঠায়। তিনি তাঁর নিজ দেশ কেনিয়ার নাকুরু শহরে জীবন উপভোগ করছিলেন। একদিন তাঁর ভালো বন্ধু তাঁকে একটি কথা জানান। ওয়েন্ডো বলেছিলেন, তিনি সেই বন্ধুর জন্য জীবন দিতে পারতেন। সেই বন্ধু জানান, তাঁর শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। ওয়েন্ডো সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ওষুধের খোঁজে নেমে পড়েন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এক মাসের মধ্যেই তাঁর বন্ধু মারা যান। এর কিছুদিন পর ওয়েন্ডো ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর তিনি এইডস এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
তাঁর বন্ধুর এই গল্প নিম্ন আয়ের দেশে খুবই পরিচিত বাস্তবতা। তবে আশার কথা হলো, ২০০০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় এখন মৃত্যুর হার কমেছে। তারপরও এই রোগে প্রতিবছর ছয় লাখ মানুষ মারা যান। নতুন করে আক্রান্ত হন আরও ১০ লাখ মানুষ। বিল গেটসের মতে, এমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব—যাতে ওয়েন্ডোর বন্ধুর মতো কারও আর এমন পরিণতি না হয়। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করছে। প্রথমবারের মতো বাস্তবসম্মতভাবে আশা করা যাচ্ছে যে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী হুমকি হিসেবে এইডসের অবসান ঘটানো যাবে।
তিনি পরিষ্কার করে বলেন, তিনি এইচআইভি ভাইরাসটিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার কথা বলছেন না। এইডসের অবসান বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন—এইচআইভিতে আক্রান্ত সিংহভাগ মানুষ এমন ওষুধ পাবেন, যা তাঁদের এইডস হওয়া থেকে রক্ষা করবে। একসময় তাঁরা এই রোগের হাত থেকে নিরাময় পাবেন। ফলে শুরুতেই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক কমে যাবে। ২০৪০–এর দশকের শেষের দিকে বড় একটি সাফল্য আশা করা যায় বলেও তিনি জানান। ২০১০ সালের তুলনায় মৃত্যু এবং নতুন সংক্রমণের হার ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও তাঁর প্রত্যাশা।
বিল গেটসের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে এইচআইভির চিকিৎসায় ব্যয়ও লাগবে না। নিম্ন আয়ের দেশগুলো অন্যান্য রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনোযোগ দিতে পারবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি তারা দ্রুত স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাবে। তিনি যোগ করেন, এটি কেবল দরিদ্র দেশগুলোর জন্য নয়—প্রায় ২০ লাখ আমেরিকান এইচআইভিতে আক্রান্ত, সেখানে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ এতে মারা যান।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এইডসের অবসানের স্বপ্ন দেখলেও বিল গেটস বলেন, তিনি আগে বিশ্বাস করতেন না যে সব প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদের কাছে আছে। তাঁর মতে, এখনো সব উপাদান নেই। তবে তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছরে সেগুলো পাওয়া যাবে। তিনি জানান, তিনটি বিষয় এইডসের অবসান সম্ভব করবে।
তিনি বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে এমন ওষুধ আছে যা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়। তবে একটি শর্ত আছে—এটি তখনই কাজ করে যখন কেউ প্রতিদিন একটি করে বড়ি বা পিল খান; কোনো দিনও ডোজ বাদ দেওয়া যাবে না। তিনি উল্লেখ করেন, এখন দীর্ঘমেয়াদি বিকল্পও এসেছে। এর একটি বড় আবিষ্কার হলো লেনাকাপ্যাভির একটি ইনজেকশন, যার একটি ডোজ আপনাকে ছয় মাস সুরক্ষিত রাখবে। গেটস ফাউন্ডেশন ভারতের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হেটেরোর সঙ্গে কাজ করছে এবং তারা এর একটি জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করছে। এর খরচ হবে রোগী প্রতিবছর মাত্র ৪০ ডলার, যা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী।
তিনি আরও জানান, রোগীরা ২০২৭ সালের শুরুতেই এটি পেতে পারেন। গ্লোবাল ফান্ড ও পেপফার এরই মধ্যে গিলিয়েডের সঙ্গে কাজ করছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে এবং অন্যান্য দেশের ৩০ লাখ মানুষকে লেনাকাপ্যাভির দেওয়ার জন্য কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সুবিধা বিশাল—উচ্চ এইচআইভি–প্রবণ এলাকার মাত্র ৪ শতাংশ জায়গায় লেনাকাপ্যাভির পৌঁছাতে পারলে নতুন সংক্রমণ ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি গবেষকেরা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প নিয়ে কাজ করছেন, যার মধ্যে রয়েছে একটি মাসিক পিল এবং লেনাকাপ্যাভির এমন একটি সংস্করণ যা পুরো এক বছর সুরক্ষা দিতে পারবে।
বিল গেটসের মতে, বিজ্ঞানীরা এখন একটি পদ্ধতি পরীক্ষা করছেন যার মাধ্যমে মূলত একটি মাত্র ইনজেকশন দিয়ে এইচআইভি নিরাময় করা সম্ভব হতে পারে। তিনি একে কার্যকর নিরাময় বলে উল্লেখ করেন, কারণ ভাইরাসটি শরীরে থেকে যাবে, তবে এটি এইডসে রূপ নেবে না। তাঁর মতে, এটি আমাদের ধারণার চেয়ে কঠিন হতে পারে, তবু তিনি এ পদ্ধতি নিয়ে খুবই আশাবাদী। এ ধরনের পদ্ধতি সফল হলে সেটি বিস্ময়কর হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান অবস্থায় এইচআইভি থাকলে প্রতিদিন একটি করে পিল খেতে হয় এবং এইডস প্রতিরোধে আজীবন এটি খেতে হয়। অন্য কারও শরীরে যেন ভাইরাস না ছড়ায়, সেজন্যও তা করতে হয়। তিনি বলেন, কার্যকর কিউর ধারণা এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে—নির্দিষ্ট জেনেটিক এডিটিং ব্যবহার করে কোষে এইচআইভির প্রবেশ রোধ করা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখানো। এতে আর কখনো অন্য কোনো পিল খেতে হবে না বলেও তাঁর বক্তব্য। তাঁর মতে, এতে অন্য কারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমে যাবে এবং নিজের ক্ষেত্রেও ভাইরাসের সংস্পর্শে এলেও আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কম থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞানীরা একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করছেন সিকল সেল রোগের একক ইনজেকশন নিরাময় তৈরির জন্য। এ রোগে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে নিরাময় পাওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এইচআইভি নিরাময় হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে হলেও গবেষণাগারের অগ্রগতি তাঁকে আশাবাদী করেছে—তাঁর মতে, তা সফল হবে।
বিল গেটস জানান, ২০১০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী নতুন সংক্রমণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তাঁর মতে, এর পেছনে বিভিন্ন সরঞ্জাম কাজ করেছে। এর মধ্যে কনডম, স্বেচ্ছায় পুরুষের খতনা এবং গর্ভবতী মায়েদের থেকে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে এইচআইভি ছড়ানো রোধ করার ওষুধ রয়েছে। এই সরঞ্জামগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশগুলো শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং দুর্গম এলাকার মানুষের কাছেও তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে—বিল গেটসের মতে, এই চাবিকাঠিই এইডসকে পরাস্ত করতে সাহায্য করবে।
তবে তিনি একটি সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। বিভিন্ন দেশের সরকার বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য তহবিল বা ফান্ড কমিয়ে দিচ্ছে। এই বাজেট কাটের ফলে ইতিমধ্যেই সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর সতর্কতা—এই ভুল যদি সংশোধন করা না হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৬৬ লাখ নতুন সংক্রমণ এবং ৪২ লাখ মৃত্যু দেখা যেতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেট কমানোর কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণাগুলো থমকে যাচ্ছে এবং দশকের পর দশক ধরে সরকারি সহায়তায় চলা গবেষণাগুলো হারিয়ে যেতে পারে।
তাঁর পক্ষ থেকে গেটস ফাউন্ডেশন জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামগুলোতে অর্থায়ন অব্যাহত রাখবে বলে জানান বিল গেটস। তবে তিনি বলেন, দানশীলতা কখনো সরকারের নেতৃত্ব ও সম্পদের বিকল্প হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশ আগের মতো উদার ও সক্রিয় ভূমিকা ফিরিয়ে আনলে সেখানে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ইতিহাসে স্মরণ করা হবে বলেও তাঁর মন্তব্য। তিনি বলেন, তাঁরা এইডসের অবসান ঘটানো নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।
শেষদিকে বিল গেটসের বার্তাটি সহজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে—বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করতে পারেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন এবং সরকারকে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। যে বিনিয়োগ এতদূর নিয়ে এসেছে, সেখানে আবারও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, তা করা গেলে একটি বড় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব—যে মহামারি অর্ধশতাব্দী ধরে মানবতাকে ধ্বংস করেছে, সেটির অবসান ঘটানো যাবে।
ভাষান্তর: জাহিদ হোসাইন খান
সূত্র: লিংকডইন