ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণের ছবি, জন্মদিনের আয়োজন কিংবা সন্তানের স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনের ছবি এবং বর্তমান অবস্থান নিয়মিত শেয়ার করেন অনেকেই। তবে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হওয়া এসব পোস্ট থেকেই সাইবার অপরাধীরা একজন ব্যক্তির পরিচয়, সম্পর্ক, দৈনন্দিন চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। পরবর্তীতে এই তথ্যের অপব্যবহার করে প্রতারণা, পরিচয় নকল, ফিশিং বা অনলাইনে হয়রানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করার আগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার প্রথম ধাপ হতে পারে একটি সহজ অভ্যাস— ‘পোস্ট করার আগে ভাবুন’।

কুইক হিল টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হরিশ কুমার জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্ত শেয়ার করা এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে একটি পোস্টের মাধ্যমে ঠিক কতটা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, তা ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না। কোনো তথ্য একবার প্রকাশ্যে চলে গেলে তা কপি, সংরক্ষণ বা পুনরায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এমনকি বিভিন্ন পোস্ট থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে একজন ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচিতি ও জীবনযাপনের ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে প্রতারকেরা। ব্যক্তিগত তথ্য এখন প্রতারণা, পরিচয় নকল ও পরিচয় চুরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতারকেরা পরিচিত ব্যক্তির নাম, ছবি ও প্রকাশ্যে থাকা অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারে। পরে সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ওই ব্যক্তির বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মুঠোফোন নম্বর, ব্যক্তিগত ই–মেইল ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা ও কর্মস্থলের তথ্য প্রকাশ না করাই শ্রেয়। নিজের তাৎক্ষণিক অবস্থান, কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন বা কত দিন বাইরে থাকবেন—এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই কারণে ভ্রমণের পরিকল্পনা, ছুটির দিনের বিস্তারিত, বিমানের বোর্ডিং পাস, টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা উচিত নয়। পরিচয়পত্রের তথ্যের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক কার্ডসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্রের ছবি বা নম্বর প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যাংক বা আর্থিক লেনদেনের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নিরাপদ নয়। পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তা প্রশ্ন বা অনলাইন অ্যাকাউন্টের তথ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে—এমন তথ্যও পোস্ট করা থেকে বিরত থাকা উচিত। একটি তথ্য আলাদাভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও প্রকাশ্যে থাকা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব।

মাল্টারবিটের ব্যবসায়িক ইউনিটের প্রধান বরুণ গ্রোভার জানিয়েছেন, ডিজিটাল মাধ্যমে একজন মানুষের রেখে যাওয়া তথ্য খুব দ্রুতই তাঁর জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। অবস্থানসংবলিত একটি ছবি বা দৈনন্দিন রুটিনের সামান্য উল্লেখ একা হয়তো তেমন কিছু নয়। কিন্তু এসব তথ্য একত্র করলে তা ফিশিং, পরিচয় নকল, অনুসরণ করে হয়রানি ও অন্যান্য ধরনের ডিজিটাল অপরাধের পথ তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপনীয়তার সেটিংস ঠিক করে রাখলেই ব্যক্তিগত তথ্য পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে এমনটি মনে করার কারণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, গোপনীয়তার সেটিংসের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু পোস্ট করার আগে সেটি থেকে কোন ধরনের তথ্য প্রকাশ পেতে পারে, তা ভেবে দেখা জরুরি। পোস্ট করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই পোস্ট থেকে কি বোঝা যাবে আমি কোথায় আছি? আমি কার সঙ্গে আছি? কেউ কি এই তথ্য ব্যবহার করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে? এই তথ্য কি আমার পরিচয় নকল বা আমাকে প্রতারণার শিকার করতে কাজে লাগতে পারে? এসব প্রশ্নের কোনো একটির উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে তথ্যটি অনলাইনে প্রকাশ না করাই ভালো। প্রয়োজন হলে তা শুধু বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে শেয়ার করা যেতে পারে।