কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় গতকাল শনিবার সকালেও ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। তবুও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে উত্তাল সমুদ্রে গোসলে নামেন কয়েক হাজার পর্যটক। লাইফগার্ড কর্মীরা ঝুঁকির বিষয়টি জানিয়ে প্রচারণা চালালেও অনেকে সতর্কতা মানছেন না।

সৈকতের কিছু অংশে গুপ্তখাল থাকার আশঙ্কায় একাধিক লাল নিশানা টাঙানো হয়। ওই নিশানাগুলোতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘বিপজ্জনক এলাকা’। কিন্তু ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত জায়গাতেও ঝুঁকি নিয়ে গোসল করতে দেখা যায় নারী-পুরুষের উপস্থিতি।

লাইফগার্ড কর্মীরা জানান, মূলত গুপ্তখালের ঝুঁকি বোঝাতেই নিশানা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, সুগন্ধা পয়েন্টসহ পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত ১৭টি গুপ্তখাল রয়েছে। এসব স্থানে আটকা পড়লে প্রাণে বাঁচানোর মতো ডুবুরি বর্তমানে সৈকতে নেই।

সুগন্ধার দক্ষিণ পাশের কলাতলী সৈকতের এক কিলোমিটারে গোসলে ব্যস্ত ছিল কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। উত্তর পাশের সি–গাল ও লাবণী পয়েন্টের দুই কিলোমিটারেও গোসলে নেমেছেন কয়েক হাজার পর্যটক। দুপুর ১২টা পর্যন্ত কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ জড়ো হন। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সৈকতে লোক আরও বাড়ে। লাইফগার্ড কর্মীদের হ্যান্ডমাইক ধরে সতর্ক করতে দেখা যায়, যখন বাতাসভর্তি টিউবে ভেসে পর্যটকেরা সাগরের বেশ গভীরে চলে যাচ্ছিলেন। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নজরদারি ও উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হিমশিম খেতে হয় বেসরকারি সি-সেফ লাইফগার্ডের ২৭ জন কর্মীকে।

সৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারে অন্তত ১৭টি গুপ্তখালের সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে সি-সেফ লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, একেকটি গুপ্তখালের গভীরতা ৬ থেকে ১০ ফুট। কলাতলী সৈকতে ৭টি, সুগন্ধায় ৫টি এবং সি–গাল ও লাবণী পয়েন্টে ৫টি গুপ্তখাল রয়েছে। ভাটার সময় পানির নিচে স্রোতের টান বেড়ে যায়, এ সময় গলাসমান পানিতে নেমে যেসব পর্যটক গোসল করেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। গত দুদিনে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে ১০-১২ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে।

বিকেল চারটায় সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় লাইফগার্ড মো. আলমের সঙ্গে। তিনি সকাল ছয়টা থেকে এ সৈকতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সৈকতের ৫ কিলোমিটারে অন্তত ৪০ হাজার পর্যটক ছিলেন। ৪০ শতাংশ পর্যটক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উত্তাল সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপ দেন। বাঁশি বাজিয়ে কাজ হয় না, একেবারে কাছাকাছি গিয়ে নিষেধ করলেও তাঁরা শোনেন না। তখন কিছুই করার থাকে না।

লাইফগার্ড মো. আলম আরও জানান, বৈরী পরিবেশ ও ভারী বর্ষণের ফলে সুগন্ধা সৈকতের এক কিলোমিটারে সৃষ্টি হয়েছে পাঁচ-ছয়টি গুপ্তখাল বা ক্যানেল। সাঁতার না জানা কেউ গুপ্তখালে আটকা পড়লে উদ্ধার করার মতো কোনো ডুবুরি এ সৈকতে নেই। লাইফগার্ডরা কেবল স্রোতে কিংবা ঢেউয়ের ধাক্কায় কেউ ভেসে গেলে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে পারেন। ডুবে যাওয়া কাউকে উদ্ধারে ডুবুরি প্রয়োজন।

সি-সেফ লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত গত ১০ বছরে সমুদ্রে গোসলে নেমে মারা গেছেন ৭৬ পর্যটক। এর মধ্যে গত বছর মারা গেছেন ২৫ জন। একই সময়ে স্রোতের টানে কিংবা ঢেউয়ের ধাক্কায় টিউব থেকে ভেসে যাওয়ার সময় উদ্ধার করা হয় অন্তত ১ হাজার ৪২ জনকে। বেশির ভাগ পর্যটকের বয়স ১৬ থেকে ২৮ বছর।

কোমরসমান পানিতে নেমে পর্যটকদের উঠে আসার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন লাইফগার্ড মো. সেলিম উদ্দিন। তবে অনেকের কথা না শোনায় এক পর্যায়ে তাঁকে বিরক্তও হতে দেখা যায়। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, বৈরী পরিবেশে সাত দিন ধরে সাগর উত্তাল রয়েছে। ভারী বর্ষণও অব্যাহত। ফলে বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গুপ্তখালের সৃষ্টি হওয়ায় সৈকতজুড়ে একাধিক লাল নিশানা ওড়ানো হচ্ছে। কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছেন না। বৃষ্টি কিছুক্ষণ না হলেই হোটেল থেকে দল বেঁধে পর্যটকেরা নেমে পড়েন সৈকতে।

এ বিষয়ে সি-সেফ লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমদ জানান, সৈকতের এই পাঁচ কিলোমিটারে গোসলে নামা পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো ২৭ জন লাইফগার্ড প্রস্তুত থাকলেও কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আরও ১১৫ কিলোমিটার সৈকতে তেমন কেউ নেই। অথচ অরক্ষিত ওই সৈকতের দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটোয়ারটেক, বাহারছড়া ও টেকনাফ সৈকতে ঝুঁকি নিয়ে শত শত নারী-পুরুষ গোসলে নামছেন। পাশাপাশি গুপ্তখাল থেকে পর্যটকদের উদ্ধারে কোনো ডুবুরিও নেই।

পুলিশ ও লাইফগার্ড জানায়, সর্বশেষ গত ২৭ জুন দুপুরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতের কাছে সমুদ্রে গোসলে নেমে মোহাম্মদ সায়েম (২২) নামের এক পর্যটক নিখোঁজ হন। পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রেজু খালে তাঁর লাশ ভেসে আসে। মো. সায়েমের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। এর আগে ৩১ মে দুপুরে সি-গাল সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হন মো. আবির (১৮) নামে ঢাকার আরেক পর্যটক। পরদিন ১ জুন সকালে ২ কিলোমিটার উত্তরে নাজিরারটেক সৈকতে তাঁর মরদেহ ভেসে আসে।

কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, গত সপ্তাহের শনিবার থেকে কক্সবাজারে ভারী বর্ষণ চলছে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সড়ক ও রেলপথ ডুবে থাকায় কয়েক দিন কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। যানবাহনের চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে হোটেল, রিসোর্টে ৬০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং বাতিল হয়েছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় শুক্রবার থেকে আবার পর্যটকের আগমন ঘটছে। শনিবার শহরের ৫ শতাধিক হোটেল-রিসোর্টে অবস্থান করছেন ২০ হাজারের বেশি পর্যটক। সৈকতে ৫০-৬০ হাজার লোকের ভিড় দেখা গেলেও বেশির ভাগ স্থানীয় অথবা দিনে এসে দিনে ফিরে যাওয়া লোকজন।

হোটেলমালিকেরা জানান, ভারী বর্ষণ ও ঢলের প্রভাবে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে। বেশ কিছু পর্যটক কক্সবাজারমুখী। বৃষ্টি কমলে এ সংখ্যা বাড়তে পারে।