নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে রেলওয়ের শতবর্ষী ৩৩টি গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপড়ে বা ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গাছগুলো কাটার অনুমতি দিয়েছে বিভাগীয় বন বিভাগ। তবে এসব গাছের বদলে চলতি বর্ষায় শহরজুড়ে পাঁচ হাজার গাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে বৃহত্তম কারখানাটি সৈয়দপুরে গড়ে ওঠে। ওই কারখানার কর্মকর্তারা ছিলেন ব্রিটিশ ইংরেজ। আর শ্রমিক–কর্মচারীরা ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। ওই সব কর্মকর্তা ও শ্রমিক–কর্মচারীদের জন্য গড়ে তোলা হয় সৈয়দপুর শহর। সে সময়ের জৌলুশপূর্ণ ওই শহরে পরিকল্পিত সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়কবাতি স্থাপন করা হয়। তখন বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে স্ট্রিটলাইটগুলো জ্বলত কুপি বাতির মাধ্যমে। গোটা শহরে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা হয়। ওই সব গাছের অধিকাংশই বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
.গাছ কাটার বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিন গুণ নয়, ওই গাছগুলোর বদলে চলতি বর্ষায় পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে গাছের চারা লাগানো শুরু হবে।তহিদুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সহকারী, সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগ
সৈয়দপুর শহরের অফিসার্স কলোনি, সাহেবপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, মুন্সিপাড়া, হাতিখানা, শহীদ আতিয়ার কলোনি, গোলাহাট ও বাঁশবাড়ী এলাকার রেলওয়ে কলোনিগুলোয় রয়েছে হাজারখানেক শতবর্ষী বৃক্ষ। এর মধ্যে ৩৩টি গাছ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই রেইনট্রি গাছ। ঘনবসতিপূর্ণ গাছগুলো প্রায় মৃত, গোড়া ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ আমলের ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো কাটার বিষয়ে শহরের সবাই একমত বলে জানান সৈয়দপুরের সামাজিক সংগঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ম আ শামীম। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘রেলের কিছু কিছু গাছ অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। এসব কেটে ফেলাই ভালো হবে। তবে আমরা চাইব বন বিভাগের নীতিমালা অনুসরণ করে যাতে গাছগুলো কাটা হয়।’
সৈয়দপুরের শিল্পপতি সিদ্দিকুল আলম বলেন, ‘জন্মের পর থেকে বিশাল বিশাল রেইনট্রি দেখছি। ব্রিটিশ আমলের গাছগুলো মারা যাচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গাছগুলো কেটে ফেলতে রেলওয়ের কাছে বহুবার দাবি জানিয়েছি।’
.রেলওয়ে পূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শহরের অফিসার্স কলোনি এলাকায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের (ডিএস) বাসভবনের একটি বড় গাছ মে মাসে সামান্য বাতাসে উপড়ে পড়ে। গাছটি ডিএস বাসভবনের সামনে সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কের ওপর আছড়ে পড়ে। এর আগে শহরের পাঁচমাথা মোড় এলাকায় একটি বিশাল রেইনট্রিগাছ উপড়ে পড়ে। গত ৩০ জুন আরেকটি গাছ জিআরপি মোড়ে ভেঙে পড়ে। সবশেষ গতকাল শুক্রবার রাতে সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কে লায়ন্স স্কুল ও কলেজের কাছে শতবর্ষী পাকুরগাছের বড় একটি ডাল ভেঙে পড়ে। এসব ঘটনায় হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও গাছগুলো নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা থাকায় এত দিন গাছগুলো অপসারণে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গাছগুলো অপসারণের জন্য রংপুরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে ১৮ মে মাসে লিখিত আবেদন করেন সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম।
.পরে বিভাগীয় বন কার্যালয় থেকে একটি প্রতিনিধিদল সৈয়দপুর শহরের গাছগুলো সরেজমিন দেখে যায়। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ১১ জুন সৈয়দপুর রেলের পূর্ত বিভাগের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে ৩৩টি গাছ কেটে ফেলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। আজ শনিবার গাছগুলো কাটার বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, ঝুঁকিপূর্ণ গাছ নির্বাচন করা হয়েছে। এসবের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রেলওয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩৩টি গাছ কেটে এর বিপরীতে তিন গুণ বৃক্ষরোপণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
.জনস্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩টি গাছ কেটে ফেলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সৈয়দপুর রেলওয়ে বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী তহিদুল ইসলাম। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিন গুণ নয়, ওই গাছগুলোর বদলে চলতি বর্ষায় পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে গাছের চারা লাগানো শুরু হবে।






