বেলা দেড়টা। রাজধানীতে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। রানী বেগমের রুটি সেঁকার চুলায় তখন আগুনের বদলে পাক খেয়ে উঠতে থাকা ধোঁয়া। ক্রেতা না থাকায় চুলায় আর আগুন দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ছে না। তবু রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের সড়কের পাশের ফুটপাতে ছোট্ট একটি দোকান রানী বেগম প্রতিদিনের মতোই চালিয়ে যাচ্ছেন। দোকানে তিনি আটার রুটি বানিয়ে বিক্রি করেন। সঙ্গে থাকে ডাল, সবজি আর ডিমভাজি।
আজ শনিবার দুপুরে বৃষ্টির কারণে তাঁর দোকানে ক্রেতাদের দেখা মেলেনি। ক্রেতাদের বসার জন্য রাখা লোহার বেঞ্চটিও ছিল ফাঁকা। মাথার ওপর টাঙানো ত্রিপলের ফুটো দিয়ে টুপটাপ করে পানি পড়ছিল। নিজের গায়ে পানি পড়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে রানী বেগম কাচের বাক্সের রুটিগুলো ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় পুরোনো একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে রাখেন। এরপরও অপেক্ষা—বৃষ্টি থামা কিংবা ক্রেতা আসার।
বেলা দেড়টার দিকে কথা হলে রানী বেগম জানান, বৃষ্টির কারণে সারা দিনই বেচাবিক্রি প্রায় বন্ধ। তবে দোকান বন্ধ রাখার সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংসারের খরচের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হইলেই কি, দোকান তো খুলতেই হইব। পেটে তো খিদা আসে। দোকান না খুললে খামু কী?’
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা রানী বেগম এখন ঢাকার মিরপুরের জনতা আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন। সংসারে স্বামী কাঞ্চন মিয়া, বৃদ্ধ মা ফাতেমা বেগম ও ছেলে সাজু মিয়া আছেন। ছেলের স্থায়ী কোনো কাজ নেই—কখনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান, কখনো মিষ্টির দোকানে কাজ করেন। স্বামীর সঙ্গে মিলেই এতদিন দোকান চালাতেন রানী। তবে গত রমজানে স্বামীর স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে তিনি আর কাজে ফিরতে পারেননি। ফলে পরিবারের দায়িত্ব এখন প্রায় একাই কাঁধে নিয়েছেন রানী।
রানী বেগমের দিন শুরু হয় ফজরের আজানের সঙ্গে। ঘুম থেকে উঠে তিনি প্রথমে ডাল আর সবজি রান্না করেন। এরপর রুটি বানানোর জন্য আটা মেখে প্রস্তুত করেন। সব কাজ শেষ করে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে তিনি চলে আসেন মিরপুর-২ নম্বরে বাংলাদেশ-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে। সেখানেই বিকেল পর্যন্ত রুটি বানিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিটি রুটি ১০ টাকা, ডাল বা সবজি ১০ টাকা এবং ডিমভাজি ২০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
দিন ভালো গেলে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার বেচাবিক্রি হয়। তবে গতকাল শুক্রবার সারা দিনের বৃষ্টিতে দোকানই খুলতে পারেননি। আর আজ সকাল ছয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৭০ টাকা। রানী বলেন, আগে সকালেই সাত কেজি আটা মেখে আনতেন। পরে দোকানেই আরও পাঁচ কেজির মতো আটা মাখতে হতো। এখন পুরো দিন মিলিয়েই চার থেকে পাঁচ কেজি আটার রুটি বিক্রি হয়।
স্বামীর চিকিৎসার খরচ নিয়েও কথা বলেন রানী বেগম। তিনি জানান, ‘ওর ওষুধে মাসে অনেক টাকা লাগে। খরচ অনেক, আমি জানি না। কারণ পোলা-মাইরাই ওষুধ কিনে দেয়। আর আমার কেনা লাগে মায়ের প্রেশারের ওষুধ। মাসে প্রায় ৭০০ টাকার মতো লাগে।’
একটু থেমে রানী বেগম বলেন, ‘কষ্ট তো অনেক। কিন্তু কষ্টের কথা ভাবলে তো চলবে না। যত দিন শরীরে শক্তি আছে, তত দিন কাজ করতেই হইব। এক দিন দোকান না খুললে সেদিনের বাজারটাই বন্ধ হয়ে যায়। তাই বৃষ্টি, রোদ যেমনই হোক, সকালে বের হই।’
বৃষ্টির মধ্যে ফুটপাতের গাছের নিচে কাঠের ছোট্ট একটি পাটাতনে জড়সড় হয়ে বসে আছেন খোকন দাস। মাথার ওপর পুরোনো একটি ছাতা। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলেও তাঁর সামনে কোনো ক্রেতা আসেননি। কখনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীদের দিকে, কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে।
রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে সড়কের পাশেই জুতা-ব্যাগ মেরামত ও পলিশের কাজ করেন খোকন। আজ সকাল নয়টায় দোকান খুলেছিলেন। তখন আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি ছিল না। তবে সকাল ১০টার পর থেকে থেমে থেমে কয়েক দফা বৃষ্টি নামে। ক্রেতা না থাকায় কাজের সুই, সুতা, কালি কিংবা ব্রাশ—কোনোটিই ব্যবহার করতে দেখা যায়নি তাঁকে।
দুপুরে কথা হলে খোকন দাস জানান, তখনও তাঁর এক টাকাও আয় হয়নি। আগের দিনও সারা দিনে কাজ হয়েছিল মাত্র ২২০ টাকার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এহনো একটা পয়সাও কামাই হয় নাই। কালকে হইছিল মাত্র ২২০ টাকার মতো। দিন যদি এরম থাকে, বাঁচমু কেমনে? আমগো তো দিনে দিনে কাম কইরা খাইতে হয়।’ দিন ভালো গেলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, কখনো এক হাজার থেকে বারো শ টাকারও কাজ হয় বলে জানান তিনি।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বাসিন্দা খোকন দাস প্রায় ২৮ বছর ধরে ঢাকার ফুটপাতে বসে জুতা মেরামতের কাজ করছেন। মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের একটি ভবনের নিচতলার এক কক্ষের বাসায় স্ত্রী চন্দনা দাস ও বড় মেয়ে প্রিয়াঙ্কা দাসকে নিয়ে থাকেন। সেই ঘরের ভাড়া মাসে ৭ হাজার টাকা। স্ত্রী একসময় পোশাক কারখানায় কাজ করলেও প্রায় দেড় বছর ধরে বেকার। বড় মেয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। মেজ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে সাগর দাস গ্রামের বাড়িতে নানির কাছে থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
বড় মেয়ে নিজের বেতনের কিছু টাকা ভবিষ্যতে বিয়ের জন্য জমাচ্ছেন। পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে থাকা ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও পাঠান। মেয়ের বিয়ের কথাও ভাবছেন খোকন। হিসাব কষে তিনি বলেছেন, খুব সাধারণভাবে বিয়ে দিলেও আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা লাগবে। সেই টাকা অল্প অল্প করে জমাচ্ছেন। কিন্তু কয়েক দিন আয় না হলে সংসার চালাতেই সেই সঞ্চয়ে হাত দিতে হয়।
কথা বলতে বলতে খোকন দাস বারবার আকাশের দিকে তাকান। এরপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আর যে কইদিন এমন থাকব, আল্লাহই জানে। রইদ হোক, বৃষ্টি হোক, ঘরে বইসা থাকার উপায় নাই। দোকানে আইসা বসি, যদি একটা-দুইটা কাজ আহে। কিন্তু সারা দিন বইসা থাইকাও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হইলে খুব কষ্ট লাগে। সংসারের খরচ, ঘরভাড়া, মাইয়ার বিয়া—সবকিছুর চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরে।’






