চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ির বেশিরভাগ এলাকায় টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পর বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে, এখনও অনেক নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পানিবন্দী মানুষের মধ্যে শুকনা খাবার ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধিরা পটিয়া, আনোয়ারা, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা এবং খাগড়াছড়ি থেকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
লোহাগাড়ায় বন্যার পানি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সাতকানিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও প্লাবিত রয়েছে। সাতকানিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের কিছু অংশ পানিতে ডুবে রয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দী রয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানিয়েছেন, "আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।"
বাঁশখালীতে উপকূলীয় অন্তত ৮টি ইউনিয়নের মানুষ এখনও পানিবন্দী রয়েছে। অনেক বাসিন্দা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন, তবে শুকনা খাবার ও সুপেয় পানির সংকটে রয়েছেন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, "গতকাল শুক্রবার সকালে বৃষ্টি কিছুটা কমার কারণে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, এমনটাই আশা করেছিলাম। তবে রাতে আবার বৃষ্টি বাড়ার কারণে নতুন করে পানি বেড়েছে।"
চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাড়িঘর, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে আছে। প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দী রয়েছে। সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ভগবানহাট, বড়ুয়াপাড়া, যতরকূল, মুন্সিভিটা ও নাজিরহাট এলাকায় তিন কিলোমিটারজুড়ে সড়ক ও বাড়ির উঠানে পানি দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, "তিন দিন ধরে পানিবন্দী থাকলেও অনেকেই এখনও ত্রাণ পাননি।"
শঙ্খ নদতীরবর্তী দোহাজারী পৌরসভার রায়জোয়ারা ও খিল্লাপাড়া এলাকাতেও একই চিত্র। কিছু স্থানে ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বন্যায় শঙ্খ নদীর চরের শত শত একর সবজিখেত তলিয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুর রহমান জানিয়েছেন, "প্রতিটি ইউনিয়নে সাড়ে চার মেট্রিক টন করে চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। যাঁরা এখনও ত্রাণ পাননি, তাঁদের কাছেও দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।"
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। গতকাল দিবাগত রাত থেকে পানি কমতে থাকায় অনেক গ্রামীণ সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে এখনও পেকুয়ার ১৫ হাজার, মাতামুহুরীর ১০ হাজার এবং চকরিয়ার ১৮ হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানিয়েছেন, "বেশির ভাগ এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। নিচু কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। বৃষ্টি না হলে সেখান থেকেও দ্রুত পানি নেমে যাবে।"
খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চার দিন ধরে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। কবাখালী ও মেরুং ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দীঘিনালার সঙ্গে রাঙামাটির লংগদুর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এখনও বন্ধ, তবে দীঘিনালা-সাজেক ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। দীঘিনালা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৭ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চেঙ্গী নদীর পানি কমে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি শহরের অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি সরে গেছে। তবে নিচু এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা রয়েছে। বন্যায় কৃষিজমি, সবজিখেত ও পুকুরের মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, "বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি মানুষকে খাবার এবং আড়াই হাজার পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। আরও ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকবে।"






