সুন্দরবনে হরিণশিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে আহত সেই বাঘিনী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। ফলে বাঘিনীটিকে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে বন বিভাগ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল রোববার সুন্দরবনের বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হতে পারে।

সুন্দরবনে অবমুক্ত করার পর বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে বন বিভাগ। এ জন্য বিচরণ এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে প্রাথমিকভাবে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা (গবেষণায় ব্যবহৃত বিশেষ ক্যামেরা) স্থাপন করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবমুক্ত করা জায়গাটি বাঘিনীটির জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা যাচাই করার জন্য আগে থেকেই ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল।

.সুন্দরবনের ‘রাজকন্যা’ বনে ফিরবে, নাকি আরও অপেক্ষা করবে.

গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে একটি বাঘিনী ফাঁদে আটকে পড়ার খবর পায় বন বিভাগ। পরদিন ৪ জানুয়ারি ট্রাঙ্কুইলাইজারগান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন করে উদ্ধার করা হয়। পরে ফাঁদ কেটে লোহার খাঁচায় করে খুলনায় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে আনা হয়।

.

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘিনীটির বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। উদ্ধারের সময় সামনের বাঁ পায়ে প্রায় তিন ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদে বারবার টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। উদ্ধার করার সময় এটি ছিল কঙ্কালসার।

.
আমরা এসব না জেনে বাঘিনীকে বনে ছাড়ছি। এখন যদি সৌভাগ্যবশত সে বেঁচে যায় এবং প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটাই হবে একমাত্র পাওয়া।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান
.

অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে মার্চের দিকে ক্ষত শুকিয়ে আসে বলে জানান বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল। বর্তমানে বাঘিনীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাঘিনীটিকে নিয়ে গতকাল শুক্রবার মেডিক্যাল বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বোর্ডের সদস্যরা বলেছেন, বাঘিনীটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং সেটি পুরোপুরি প্রকৃতিতে ছাড়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। আজ শনিবার খুলনায় বাঘবিশেষজ্ঞদের একটি দল আসবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে রোববার বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হতে পারে।

.
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবমুক্ত করা জায়গাটি বাঘিনীটির জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা যাচাই করার জন্য আগে থেকেই ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল।
.

বন্য প্রাণিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ বা বাঘিনীর একটি নির্দিষ্ট বিচরণক্ষেত্র বা টেরিটরি থাকে। যে এলাকা থেকে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি এখনো তার নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো বাঘ বা বাঘিনী সেখানে বিচরণ শুরু করে থাকতে পারে। যদি সে ফিরে গিয়ে নিজের পুরোনো এলাকা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তাহলে তাকে নতুন এলাকা খুঁজতে হবে অথবা অন্য বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে হবে। পূর্ণবয়স্ক বাঘের মধ্যে এ ধরনের সংঘর্ষ কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়।

অবমুক্ত করার হলে বাঘিনীটির গতিবিধি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে বন বিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সুস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই মাসের মধ্যেই বাঘিনীটিকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে স্যাটেলাইট কলার (বিশেষ ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস, যা বন্য প্রাণীর গলায় কলারের মতো পরিয়ে দেওয়া হয়) সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাঘিনীটির বিচরণ এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে প্রাথমিকভাবে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

.
বন্য প্রাণিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ বা বাঘিনীর একটি নির্দিষ্ট বিচরণক্ষেত্র বা টেরিটরি থাকে। যে এলাকা থেকে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি এখনো তার নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
.

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকেই ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়। রোববার বাঘিনী অবমুক্ত করার সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

বাঘিনীটির চিকিৎসা ও করণীয় নির্ধারণ করতে গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ। গতকাল রাতে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আজকে ১০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়েছি। আগামীকাল (রোববার) বাকি ১০টি বসাব।’ বাঘিনীটির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, টেরিটরি বা বিচরণ এলাকা মূলত পাহাড়া দেয় পুরুষ বাঘ। এটি বাঘিনী হওয়াতে একটি সুবিধা হয়েছে। সাধারণত স্ত্রী বাঘ আরেকটি স্ত্রী বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় না। অন্যদিকে একটি পুরুষ বাঘ এক থেকে তিনটি পর্যন্ত স্ত্রী বাঘকে তার বিচরণ এলাকায় স্বাগত জানায়।

.
আমরা আজকে ১০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়েছি। আগামীকাল (রোববার) বাকি ১০টি বসাব।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ
.

ক্যামেরা ট্র্যাপের পরিকল্পনা আরও আগে থেকে করা উচিত ছিল বলে মনে করেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান। কারণ হিসেবে গতকাল তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাঘিনীর বিচরণ এলাকায় অন্য বাঘ এসে দখল করেছে কি না, সেটা জানাটা তার জীবন রক্ষার জন্যই জরুরি ছিল। এ ছাড়া বাঘিনীর শিকার এলাকার প্রতি বর্গকিলোমিটারে কত শূকর বা হরিণ আছে, সে উপাত্তও জরুরি ছিল বলে জানান রেজা খান। তিনি বলেন, ‘আমরা এসব না জেনে বাঘিনীকে বনে ছাড়ছি। এখন যদি সৌভাগ্যবশত সে বেঁচে যায় এবং প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটাই হবে একমাত্র পাওয়া।’

.শিকারির ফাঁদে আহত বাঘিনী ফিরছে সুন্দরবনে, গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ২০ ক্যামেরা