টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে। আজ শুক্রবার সকাল থেকে রোদ ওঠায় চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীসহ বিভিন্ন উপজেলার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এর বিপরীতে চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর আটটি ইউনিয়নে জনদুর্ভোগ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রধান সড়কগুলো এখনো জলমগ্ন থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
বাঁশখালী উপজেলায় গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ও মঙ্গলবার নামা পাহাড়ি ঢলে ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছয়টি ইউনিয়নে পানি কমলেও খানখানাবাদ, বাহারছড়া, কাথারিয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, ছনুয়া, সরলসহ আটটি ইউনিয়নে পানি উল্টো বেড়েছে। সরেজমিনে বাহারছড়া, শেখেরখীল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ বসতভিটা দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে। রান্নাবান্না বন্ধ থাকায় মানুষ শুকনা খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। জানমাল রক্ষায় অনেক পরিবার নারী ও শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিলেও মালামাল পাহারায় পুরুষ সদস্যরা বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বাঁশখালীর ২১২টি গ্রামের মধ্যে অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন এবং এক লাখের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুঁইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, ঘর তলিয়ে যাওয়ায় তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বাড়িতে ফিরবেন। একই এলাকার মোহছেনা খাতুন বলেন, “১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও এমন কষ্ট পাইনি। জানি না ছেলেমেয়েদের নিয়ে কীভাবে থাকব।”
ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম সিকদার বলেন, স্লুইসগেট দিয়ে পানি নামলেও অতিরিক্ত পানির কারণে পুরো ইউনিয়ন এখনো প্লাবিত। সরকারিভাবে আড়াই টন চাল ও ৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ওসমান গনী জানান, তাঁর ইউনিয়নে এক হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী এবং তিন দিন ধরে অনেকের চুলা জ্বলেনি। বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, “বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল এবং আড়াই হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ আরও বাড়ানো হবে।”
এদিকে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির পানি নামতে শুরু করায় ভেসে উঠছে সড়ক, সেতু ও মৎস্য খামারের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। তবে হাটহাজারীর শিকারপুর, দক্ষিণ বুড়িশ্চর ও মাদার্শা ইউনিয়নে এখনো জলাবদ্ধতা কাটেনি। শিকারপুরের বাসিন্দা লোকমান হাকিম জানান, তিনি তিন দিন ধরে রাউজানে মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
খাগড়াছড়িতে চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি কমতে শুরু করায় শহর এলাকা থেকে পানি নামছে। তবে দীঘিনালা-লংগদু ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে টানা তৃতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাঘাইহাট-মাচালং-সাজেক সড়ক ও মহালছড়ির একটি সেতু তলিয়ে থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি থেকে আসা অনিমেষ চাকমা জানান, পথে চারটি স্থানে পানি থাকায় তাঁকে পাঁচবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।
দীঘিনালার ইউএনও তানজিল পারভেজ জানান, ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের বেশি পরিবারের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, “জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষ ও পানিবন্দী পরিবারগুলোর জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
বান্দরবানে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কসহ রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন। বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন মণ্ডল বলেন, “বৃষ্টি আগের তুলনায় কমেছে। তবে ১২ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।”
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন মুক্তকণ্ঠের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, আনোয়ারা ও রাউজান প্রতিনিধি]






