কসাইখানায় জবাই করা পশুর মাথা, শিং কিংবা হাড় সাধারণত বর্জ্য হিসেবেই নর্দমায় ঠাঁই পায়। তবে সেই পরিত্যক্ত অংশগুলোকেই নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় দৃষ্টিনন্দন শোপিসে রূপান্তর করছেন রাজশাহীর এক মাংস বিক্রেতা। বছরের পর বছর ধরে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের হাড় সংগ্রহ করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা।
রাজশাহী মহানগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভাড়ালিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. রিপন আলী (৪২) পেশায় একজন মাংস বিক্রেতা। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি এই পেশায় যুক্ত। তাঁর বাবা ও দাদাও একই কাজ করতেন। তবে ২০১৭ সাল থেকে রিপনের মধ্যে হাড় ও শিং সংগ্রহের এক বিচিত্র নেশা তৈরি হয়।
শুরুর গল্পটা ছিল নিছক শখের। রিপন আলী জানান, প্রথমে তিনি একটি শিং সংগ্রহ করেছিলেন। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে পুরো মাথা সংরক্ষণের পরিকল্পনা করেন। সেই থেকে শুরু। এখন তিনি রাজশাহীর বিভিন্ন হাট-বাজার ও কসাইখানায় ঘুরে বেড়ান আকর্ষণীয় শিংয়ের সন্ধানে। পরিচিতদের কাছে নিজের নম্বর দিয়ে রেখেছেন, যাতে কোথাও বড় শিং বা মাথার খোঁজ পেলে দ্রুত সংগ্রহ করতে পারেন।
রিপন বলেন, ‘শুরুতে বিক্রির কথা মাথায় ছিল না। ভালো লাগত, তাই সংগ্রহ করতাম। পরে দেখলাম আমার সঞ্চয়ের অনেকটাই এখানে চলে গেছে। তখন ভাবলাম, যদি মানুষ পছন্দ করে, তাহলে বিক্রি করা যেতে পারে।’
একটি পশুর মাথাকে পূর্ণাঙ্গ শোপিসে রূপ দেওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ও ধৈর্যশীল কাজ। ভেড়া বা ছাগলের মাথা প্রস্তুত করতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগলেও গরুর ক্ষেত্রে সময় লাগে আরও বেশি। রিপন জানান, শুধু মাংস পরিষ্কার করলেই হয় না, হাড়ের ভেতরের অংশগুলো বিশেষ দ্রবণমিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রেখে চিমটা দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। দুর্গন্ধ দূর না হওয়া পর্যন্ত চলে ধোয়ামোছার কাজ। রিপনের দাবি, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে এসব শিল্পকর্ম ৫০–৬০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
এই নেশার পেছনে রিপনকে বড় অঙ্কের অর্থও ব্যয় করতে হয়েছে। কখনো একটি মাথা কিনতেই খরচ হয়েছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। শুরুতে পরিবারের সদস্যরা দুর্গন্ধ ও ঝামেলার কারণে বিরক্ত হলেও এখন তাঁরা রিপনের কাজে খুশি। রিপন বলেন, ‘শুরুতে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন সবাই খুশি। কারণ, তারা দেখতে পাচ্ছে বিষয়টা অন্য রকম কিছু।’
পরিবেশ রক্ষায়ও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন রিপন। তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ শখ করে বিভিন্ন প্রাণীর মাথা বা শিং সংগ্রহ করতে চায়। আমার মনে হয়, গৃহপালিত পশুর এসব শিল্পকর্ম যদি সহজে পাওয়া যায়, তাহলে বন্য প্রাণীর ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে।’
রিপনের এই বিচিত্র সংগ্রহ দেখতে এখন অনেকেই তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন। দেয়ালে সাজানো গরু, মহিষ ও গাড়লের বাঁকানো বা প্যাঁচানো শিং দেখে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা। নগরের বাসিন্দা মো. রাশেদ বলেন, ‘আমি শুনেছিলাম এ রকম সংগ্রহ আছে। তাই ছুটির দিনে চলে এলাম। রাজশাহীতে প্রথমবার সরাসরি দেখলাম। ফেলে দেওয়া জিনিসকে এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।’
আরেক দর্শনার্থী মোসা. সাইনুর বলেন, যে জিনিস মানুষ সাধারণত ফেলে দেয়, সেটাকে এত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা সত্যিই অবাক করার মতো। দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখলে এটি শিল্পকর্ম বলেই মনে হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের অধ্যাপক মো. বনি আদম এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, রিপন যে ধরনের কাজ করছেন, তা নিঃসন্দেহে শিল্পকর্মের পর্যায়ে পড়ে। শিল্পকলায় ‘ফাউন্ড অবজেক্ট’ নামে একটি ধারা রয়েছে, যেখানে পরিত্যক্ত বা ফেলে দেওয়া বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করে শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রিপনের কাজটি ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয়। তিনি মূলত শখের বশে এসব কাজ করছেন। তবে নান্দনিকতার দিকটি আরও পরিশীলিত করা গেলে তাঁর শিল্পকর্মের মান আরও সমৃদ্ধ হবে।
বর্তমানে রিপনের সংগ্রহে কয়েক ডজন শিল্পকর্ম রয়েছে। শৌখিন ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তিনি এখন কিছু কাজ বাণিজ্যিকভাবে করার পরিকল্পনা করছেন।






