সকালের সূর্য পুরোপুরি তেজ ছাড়ানোর আগেই ময়মনসিংহের ভালুকার নয়নপুর গ্রামে এক বাগান ঘুরে দেখা যায়—ফলের ভারে নুয়ে থাকা সারি সারি লটকনগাছ। হলুদাভ পাকা ফলের থোকা হাতে নিয়ে কখনো পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করেন রোকন উদ্দিন, আবার কখনো দূরদূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের সঙ্গে উন্নত জাতের কলম-চারা দেখাশোনা করেন।
কয়েক বছর আগেও তিনি ছিলেন হাফেজ রোকন উদ্দিন—মসজিদের ইমাম হিসেবে পরিচিত। আজ বাগানভিত্তিক ফলচাষে তিনি সফল উদ্যোক্তা এবং উন্নত জাতের লটকনের চারা উৎপাদনে কাজ করছেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাঁর বাগানে উদ্ভাবিত একটি জাত এখন স্থানীয়ভাবে ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে পরিচিত।
গত সোমবার উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামে গিয়ে রোকন উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। বাগান ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে তিনি নিজের কৃষক হয়ে ওঠার পেছনের গল্প শোনান। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করেছেন। ধর্মীয় দায়িত্বের মধ্যেও গাছ লাগানোর আগ্রহ বজায় ছিল; সুযোগ পেলেই ফলগাছ রোপণ করতেন—মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা বাড়ির আঙিনায়। পরে সেই শখই তাঁকে বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষের দিকে নিয়ে যায় বলে জানান।
রোকন উদ্দিন জানান, ২০১৮ সালে মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে ৩০টি লটকনের চারা কিনে কাজ শুরু করেন। শুরুতে বড় বাধার মুখে পড়তে হয়—অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি। পরে তিনি নিজেই কলম করার কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন করে বাগান গড়ে তোলেন। পুরোনো এক বিঘা জমির পাশাপাশি নতুন করে তিন বিঘা জমিতে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ শুরু হয়। ২০২৩ সাল থেকে ফল আসার ধারাবাহিকতায় সাফল্য মিলতে শুরু করে।
তিনি বলেন, আট বছরে ৮–১০টি জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে যাচাই-বাছাই শেষে দুটি জাতকে সবচেয়ে উপযোগী মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুব মিষ্টি এবং বাজারেও চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি। উন্নত এ জাতটির নামকরণ নিয়েও একটি ঘটনা আছে বলে জানান রোকন উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য, কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’–এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ চলতি বছর তাঁর বাগান পরিদর্শনে এসে গ্রামের নাম অনুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই জাতটি পরিচিতি পায়।
প্রকৌশলী থেকে আঙুরচাষি, এক বছরেই আয় ৩৬ লাখ টাকা।
রোকন উদ্দিন বলেন, বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে লটকনের চাষ করছেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি কলম করে চারা উৎপাদন করেন এবং বিক্রিও করেন। তিনি জানান, এক বছরের কলম চারা ১০০ টাকা এবং দেড় থেকে দুই বছরের কলম চারা ২০০–২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বছরে তার এখানে ৫-৮ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা প্রতিবছর তাঁর বাগান থেকে চারা সংগ্রহ করেন। ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন—এমন উদ্বেগ থেকেই পরীক্ষিত গাছ নির্বাচন করে চারা বানানোর কথা জানান তিনি। ‘চারা নিয়ে যেন অন্যরাও সফল হন, সেটাই চান’ বলেও উল্লেখ করেন।
বর্তমানে বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান রোকন উদ্দিন। মৌসুম শুরুর পরপরই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন বলেও দাবি করেন। সামনে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফল পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাতও করেন বলে জানান রোকন উদ্দিন।
চারা কিনতে আসা গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মো. এনামুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর বাগান দেখে এসেছিলাম। ফল খেয়ে খুব ভালো লেগেছে। তাই ৩২টি কলম চারা কিনেছি। সফল হলে আমিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।’
লটকনের ফল বড়, দেখতে সুন্দর এবং খেতে মিষ্টি হয়—এমন কথা বলেন স্থানীয় কৃষক আবদুস সালাম। তিনি আরও বলেন, এসব কারণে চারার প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাই এখানে অনেকে আসেন চারা নিতে ও ফল কিনতে।
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, শখ থেকে শুরু হওয়া রোকন উদ্দিনের পথচলা এখন আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে গ্রামবাংলার পতিত জমিও একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
উপজেলার প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, রোকন উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তারা উন্নত মানের চারা উৎপাদন করায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।






