বর্ষার আগমনে জলমগ্ন হয়ে প্রকৃতির এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর। দিগন্তজোড়া জলরাশির মাঝে ঢেউয়ের খেলা আর ছোট ছোট নৌকার আনাগোনা এখন এই হাওরের প্রধান দৃশ্য। বিশেষ করে মাছ ধরার নৌকাগুলোর সাদা-নীল পাল হাওরের বুকে এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করেছে।

মৌলভীবাজার শহর থেকে উত্তরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাদিপুর ও অন্তেহরি গ্রামের সংলগ্ন এই হাওর বর্ষায় এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে যায়। মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির ভেজা পথে এই এলাকাটি যেন প্রকৃত অর্থেই ‘হাওরকন্যা’ হয়ে ওঠে। বর্ষার এই সময়ে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় নৌকা। কাদিপুর অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে নৌকায় করে হাওরের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় মেঘের ছায়া আর হিজল-করচের ঝোপের এক মায়াবী দৃশ্য।

স্থানীয় অনেকের কাছে এই হাওরই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পুঁটি, মলা, ট্যাংরা ও চিংড়িসহ বিভিন্ন ছোট জাতের মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ আবার পরিবারের খাবারের জন্য মাছ ধরতে বের হন। পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়ে যাতায়াত এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে নৌকার ব্যবহার এখানে অপরিহার্য।

তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু দীর্ঘশ্বাস। এবার হঠাৎ আসা ঢলের পানিতে অনেক কৃষকের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে, যা স্থানীয়দের মনে গভীর হাহাকার তৈরি করেছে। তবুও এই মাঠ-ঘাটের মায়ার টানেই তারা এখানে জীবন অতিবাহিত করছেন।

এলাকার বাসিন্দা কাদিপুর গ্রামের গৌরা নমশূদ্র, জুমাপুরের মো. লকনু মিয়া ও ব্যবসায়ী আবদুল মুহিত জানান, বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাউয়াদীঘি হাওর জলে ভরা থাকে। বর্ষার এ সময়টিতে হাওরপারের প্রায় বাড়িতেই পানি ওঠে, রাস্তাঘাট ডুবে যায়। বাড়িঘর থেকে নৌকা ছাড়া বের হওয়ার উপায় থাকে না। জলের গ্রাম অন্তেহরিসহ বিভিন্ন গ্রামের অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের নিজের নৌকা নেই। বর্ষায় তাঁরা চলাফেরা করতে, গরু-বাছুরের ঘাস সংগ্রহ করতে নৌকা ভাড়া করেন। একটি নৌকার ভাড়া মাসে ন্যূনতম দুই হাজার টাকা।

দিন শেষে যখন সূর্যের আলো মেঘের গায়ে লেগে পশ্চিম আকাশে রং ছড়ায়, তখন কাউয়াদীঘি হাওরের রূপ আরও মোহময় হয়ে ওঠে। গবাদিপশু নিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষ আর আকাশে বক-চিলের উড়ন মিলিয়ে এক শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশের সৃষ্টি হয় এই হাওর এলাকায়।