সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আপিল শুনানিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুরক্ষা চেয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানিকালে তিনি আদালতকে জানান, পঞ্চদশ সংশোধনী একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পাস করা হয়েছিল। তবে এই সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল করা হলে কিছু ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা বা শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত আজ বুধবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপসহ সংবিধানের বেশ কিছু পরিবর্তনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক আপিল করা হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চারজন, নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব আপিল দায়ের করেন।

শুনানি শেষে আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হলে সংবিধান থেকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই কাউন্সিল ব্যবস্থাটি প্রথমে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে এবং পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর এটি অসাংবিধানিক হয়ে পড়লেও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে এই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে।

শরীফ ভূঁইয়া আরও জানান, পঞ্চদশ সংশোধনীর ৩১ ধারার মাধ্যমে বিচারকদের মেয়াদ ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘চতুর্থ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে একটা রাজনৈতিক দল থাকবে—এটি সংবিধানে যুক্ত হয়। সামরিক ফরমান দিয়ে তা বিলুপ্ত করা হয়, যা পঞ্চম সংশোধনীতে বৈধতা পায়। সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪১ ধারার মাধ্যমে ওই বিলুপ্তি বহাল থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৬ ধারার মাধ্যমে কতিপয় আদেশ ও নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা সম্পর্কিত সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়। শুনানিতে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের এই তিনটি ধারা (৩১, ৩৬ ও ৪১) অসাংবিধানিক ঘোষণা না করার নিবেদন রেখেছি, সুরক্ষা চেয়েছি। বাকি সবকিছু অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারেন, তাতে কোনো শূন্যতা তৈরি হবে না বলেছেন।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি আদালতকে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে কার্যত পুনর্লিখন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি বা নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো সংসদের এখতিয়ারভুক্ত হওয়া উচিত। শিশির মনির বলেন, ‘যেগুলো সংবিধানের মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ করে দেওয়া হয়েছে; তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি না থাকে তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। গণতন্ত্র না থাকলে সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রতিযোগিতা—সবকিছুই ব্যাহত হয়। এ জন্য বলেছি যেসব বিষয় বেসিক স্ট্রাকচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। তবে যেগুলোর ব্যাপারে বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন নেই, বরং রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার, সেগুলো যেন সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।’

শুনানিতে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক, অন্য আপিলকারীর পক্ষে এ এস এম শাহরিয়ার কবির এবং ইন্টারভেনার হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক ও হামিদুল মিসবাহ অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।