উত্তরায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে মেট্রোরেলে চড়তে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের উত্তর পাশের সরু ফুটপাত দিয়ে স্টেশনের দিকে এগোচ্ছিলেন ফেরদৌসী শেফা। বিপরীত দিক থেকে আসা এক পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে তাঁর কাঁধের ব্যাগটি ফুটপাতে পড়ে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতিতে কিছু বলতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত দমে যান তিনি। কারণ, এই পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী হিসেবে এমন বিড়ম্বনা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, এটি কেবল ফেরদৌসী শেফার একার সমস্যা নয়, বরং স্টেশনের নিচ দিয়ে যাতায়াত করা প্রতিটি যাত্রী ও পথচারীর নিত্যদিনের চিত্র। উত্তরা থেকে প্রতিদিন মিরপুরে কর্মস্থলে যাতায়াত করা ফেরদৌসী শেফা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেখলেনই তো, হাঁটার উপায় নেই। পুরো ফুটপাত হকার আর ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলে। কিছু বলতে গেলেও উল্টো তারাই খেপে যায়। তাই এখন আর কিছু বলি না, চুপচাপ নিজের কাজে চলে যাই।’

সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনের দুই পাশের ফুটপাতের সিংহভাগই এখন ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলে। কোথাও চা-শিঙাড়া, কোথাও চটপটি, আবার কোথাও কাপড় ও বিবিধ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। ফলে ফুটপাতে পাশাপাশি দুজন মানুষের হাঁটাও দায় হয়ে পড়েছে। পথচারীরা জানান, মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ফুটপাতে দোকান বসাতে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। প্রতিবেদক হকার পরিচয়ে কথা বললে কয়েকজন হকার ‘আবুল’ নামের এক ব্যক্তির সন্ধান দেন, যিনি নতুন দোকান বসানোর বিষয়টি দেখভাল করেন। সোমবার বিকেলে স্টেশনের নিচে নতুন একটি দোকান বসানোর কাজ করছিলেন তিনি। আবুলের কাছে চায়ের দোকান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেন, ‘চা দোকান দিলে ২০ হাজার টেকা লাগব।’ অন্য ধরনের দোকানের জন্য কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তাঁর জবাব, ‘অন্যডি বসাইলে ৩০ হাজার লাগব।’

টাকা কমানোর অনুরোধ করা হলে ক্ষুব্ধ হয়ে আবুল বলেন, ‘মাইনষে পজিশন পায় না, আপনে আইছেন কমাইতে। এক টেকাও কম হইব না।’ তিনি জানান, অগ্রিম টাকার পাশাপাশি প্রতিদিন বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার জন্য ১৫০ টাকা দিতে হবে। স্টেশনের সিঁড়ির ঠিক সামনে দোকান বসাতে চাইলে অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা এবং দৈনিক ৩০০ টাকা ধার্য করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে তিনি অভয় দিয়ে বলেন, অভিযান হলে আগের দিনই দোকানিদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তাই তাঁদের কোনো সমস্যা হয় না।

একই চিত্র দেখা গেছে কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও মতিঝিল স্টেশনেও। প্রতিদিন সাড়ে চার লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করা মেট্রোরেলের এই স্টেশনগুলোতে সকাল-সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে। মতিঝিল স্টেশনের নিচে হকারদের কারণে পথচারীদের হাঁটার জায়গা এতটাই সংকুচিত যে, যাত্রীদের দোকানের ফাঁক গলে চলাচল করতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই এসব দোকান বসে।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) অবশ্য দাবি করেছে, তারা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে। গত ৩০ জুন কাজীপাড়া, ১৪ জুন কারওয়ান বাজার এবং ২ জুন উত্তরা উত্তর ও উত্তরা সেন্টার স্টেশনে অভিযান চালানো হয়েছে। ডিএমটিসিএলের উপপ্রকল্প পরিচালক আহসান উল্লাহ শরিফী গতকাল মঙ্গলবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ হকার বসে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

তবে যাত্রীদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযানে স্থায়ী সমাধান আসছে না। শাহবাগ স্টেশনের কয়েকজন হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযানের খবর তাঁরা আগেই পেয়ে যান এবং মালামাল সরিয়ে ফেলেন। অভিযান শেষ হলেই আবার পসরা সাজিয়ে বসেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযানের দাবি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচের ফুটপাত হকারদের দখলেই থেকে যাচ্ছে।