রাজশাহীর শেখপাড়া বেতপট্টিতে এক সময় সিলেট থেকে আসা কারিগরদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল বেতশিল্পের ব্যস্ততা। নগরের শেখপাড়ার ওই অংশ ছিল কারিগর ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর। এখন তা অনেকটাই থেমে গেছে। সিলেট থেকে আসা সেই দলের মধ্যে একমাত্র যিনি রয়েছেন—তিনি ফরিদুর রহমান; দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে বেতশিল্পকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মাত্র দেড় বছর বয়সে ফরিদুর রহমান বাবাকে হারান। ১৫ বছর বয়সে হারান মাকেও। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় পৃথিবীতে আর আপন বলতে কেউ ছিল না। তখন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের হাত ধরে রাজশাহীতে আসেন। এই আসাটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সফর হয়ে দাঁড়ায়।
রাজশাহীর মাটিতেই গড়েছেন সংসার, ব্যবসা। তবে সিলেট শহরের কাজীবাজারের পৈতৃক ভিটায় আর ফেরার মতো ভাগ্য জোটেনি—বর্তমানে সেই স্বজনসূত্রই যেন বেতশিল্প।
সম্প্রতি শেখপাড়ার সরু রাস্তায় ঢুকলেই চোখে পড়ে বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি ও আয়নার ফ্রেম। বেতপট্টির তিনটি দোকানের একটি ফরিদুর রহমানের। সেখানে বসেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
দেশের বাড়িতেই বেতের কাজ শিখেছিলেন ফরিদুর। রাজশাহীতে এসে সে দক্ষতাকে কাজে লাগান। শুরুতে তৎকালীন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ক্যাডেট কলেজের কিছু কাজের সুযোগ পান। পরে নিজের শ্রম, দক্ষতা ও সততার ওপর ভর করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ব্যবসা। একসময় তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতেন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল একাধিক দোকান।
বর্তমানে বেতপট্টি এলাকায় মাত্র তিনটি দোকান টিকে আছে—এর মধ্যে একটি ফরিদুর রহমানের। দোকানের চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাঁচামাল-বাঁশের কাঠি ও কাঁচা বাঁশ। পেছনে ঝুলছে বিভিন্ন আকারের সুন্দরভাবে তৈরি করা বাঁশের দোলনা বা আরামদায়ক চেয়ার, যা এই শিল্পের বৈচিত্র্য ও নান্দনিকতার প্রমাণ দেয়। বিক্রয়ের জন্য থরে থরে সাজানো আকর্ষণীয় ডিজাইন ও রঙের বৈচিত্র্যময় বাঁশের ঝুড়ি—লাল, সবুজ ও কালো রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এসব ঝুড়ি ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন বা ব্যবহারের জন্য উপযোগী।
বয়সের ভার থাকলেও মুখে দেখা যায় কঠোর পরিশ্রমের ছাপ। শেখপাড়ার দোকানেই যেন তাঁর অর্জিত স্থিতি। কথার ভেতরেও স্পষ্ট থাকে বেতশিল্প ধরে রাখার তাগিদ।
ফরিদুর রহমানের ভাষ্য, সিলেট নগরের কাজীবাজার এলাকায় তাঁদের বাড়ি ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলের সেই জমির বর্তমান মূল্য এক থেকে দুই কোটি টাকার মতো হতে পারে বলে তাঁর ধারণা। কিন্তু সাত দশক ধরে রাজশাহীতে বসবাসের সুযোগে আত্মীয়স্বজনই ধীরে ধীরে জমিজমা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন।
বৃদ্ধ কণ্ঠে কোনো ক্ষোভের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি। তিনি বলেন, ‘এখন মামলা-মোকদ্দমা করেও আর কিছু হবে না। এত বছর পরে কাগজপত্রও নাই, সাক্ষীও নাই। যা একটু দুই আনা পাইছি, তাই নিয়াই ফিরে আইছি।’
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে আসে। বয়স যেন কথার ভারও বাড়িয়ে দেয়। স্পষ্ট শুনতে হলে বারবার তাঁর একেবারে কাছে ঝুঁকতে হয়।
সিলেটে এখন আর তেমন যাওয়া হয় না ফরিদুরের। যেতে চাইলেও হিসাব কষতে হয়। তাঁর হিসাবে, একবার পরিবার নিয়ে গেলে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। যাতায়াতের ব্যয় তো আছেই, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতেও কিছু না কিছু তুলে দিতে হয়। সব মিলিয়ে সেই যাত্রা তাঁর মতো বৃদ্ধ মানুষের কাছে এখন বিলাসিতা।
এর চেয়েও বড় কথা, যে বাড়িতে ফেরার জন্য একসময় মন ছটফট করত—সেখানে এখন আর অপেক্ষা করে নেই মা, নেই বাবা, নেই আপন ভাই–বোন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মানুষ তো আপন মানুষের টানেই যায়। আমার তো সেই টানটাই আর নাই।’ তাই কাজীবাজারের সেই ভিটে এখন শুধু স্মৃতিতেই আছে। বাস্তবে তাঁর ঠিকানা হয়ে গেছে রাজশাহীর শেখপাড়ার বেতপট্টির ছোট্ট এই দোকান।
ফরিদুর রহমানের সঙ্গে কথার মাঝেই দোকানে ঢোকেন দুই নারী ক্রেতা। তাঁরা কয়েক দিন আগে দুটি ছোট বেতের ঝুঁড়ি বানাতে দিয়েছিলেন। এবার আরও একটি ঝুড়ি নিতে চান। দোকানে রাখা ঝুড়িগুলোর দাম ২৫০ টাকা থেকে শুরু। কিন্তু সেই দুই নারী আগের মতোই ২০০ টাকা করে ঝুড়িটি চান।
ফরিদুর রহমান তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন—আগে থেকে তৈরি কোনো ঝুড়ি যখন প্রায় শেষ হয়ে যায় তখন সেগুলো কম দামে দেওয়া যায়; কিন্তু নির্দিষ্ট সময় বেঁধে নতুন করে বানাতে হলে কারিগরকে বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই দামও কিছুটা বাড়ে। কিছুটা দর-কষাকষির পর ক্রেতারা আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে দিতে রাজি হন।
কিছুক্ষণের মধ্যে দোকানে আসেন আরও দুই তরুণী। তাঁদের হাতে একটি নতুন নকশার ছবি। সেই নকশা দেখে একই রকম একটি বেতের সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব কি না জানতে চান তাঁরা। ফরিদুর রহমান ছবিটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। তারপর মৃদু হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, ‘এখন আর ওই কাজ করার শক্তি নাই। বয়স হইছে।’ বলেই পাশের দোকানের দিকে যেতে ইশারা করেন।
তরুণীরা জানান, পাশের দোকান থেকেই তাঁদের এখানে পাঠানো হয়েছে। অন্য দোকানিদের বিশ্বাস, নতুন নকশা বা জটিল ডিজাইনের কাজের জন্য এখনো ফরিদুর রহমানের কাছেই আসতে হয়। তিনিই বেতপট্টি এলাকার সবচেয়ে অভিজ্ঞ কারিগর।
কিন্তু বৃদ্ধ কারিগর এবারও বিনয়ের সঙ্গে না বলেন। বয়স আর অসুস্থতা তাঁকে নতুন কিছু শুরু করার সাহস দেয় না।
ফরিদুর রহমান নিজেকে শুধু দক্ষ কারিগর হিসেবে নয়, উদ্ভাবক হিসেবেও মনে করেন। তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে ভয়াবহ বন্যায় বেতের সংকট দেখা দিলে কারখানার কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন একদিন চায়ের দোকানের সামনে ঝুলতে থাকা প্লাস্টিকের সরু ফিতা দেখে মাথায় আসে নতুন চিন্তা। সে সময় পাকিস্তানের করাচির এক কোম্পানি থেকে সেই প্লাস্টিকের সুতা এনে শুরু করেন প্লাস্টিকের বোনা আসবাব তৈরির কাজ। তাঁর ভাষ্য, তখন অনেকেই তাঁকে পাগল বলেছিলেন; কেউ বিশ্বাস করেনি প্লাস্টিক দিয়ে চেয়ার বা আসবাব তৈরি করে মানুষ ব্যবহার করবে; কিন্তু সময়ই তাঁর ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করে। পরে সেই পথ অনুসরণ করে রাজশাহীর অন্য ব্যবসায়ীরাও একই কাজ শুরু করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে চিত্র বদলেছে। প্লাস্টিক, স্টিল ও আধুনিক আসবাবের দাপটে কমেছে বেতের চাহিদা। তবু প্রতিদিন দোকানে বসেন ফরিদুর রহমান। বয়সের ভারে আর নিজে কাজ করতে পারেন না, তবে কারিগরদের কাজ দেখেন এবং পরামর্শ দেন।
নিজের ছেলেদের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপও শোনা যায়। তাঁর ভাষ্য, ‘নিজের ছেলেরা কেউ এই পেশাকে এগিয়ে নিতে চাননি।’ তাঁর আরেকটি আক্ষেপ—সন্তানেরা ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে দোকানের মালিকানা নিয়েই বেশি আগ্রহী। দায়িত্ব না নিয়ে শুধু দোকান হাতে নিলে এই ব্যবসা টিকবে না—এমন কথা বলে তিনি জানান, এখনো পুরোপুরি দোকান তাঁদের হাতে তুলে দেননি।
গত বছর স্ট্রোক করার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। এখন নিজে কোনো কাজ করতে পারেন না। দোকানে বসে শুধু কারিগরদের কাজ দেখেন। তবে সেই জায়গাতেও হতাশা আছে। তিনি বলেন, ‘আগের মতো বিশ্বস্ত কারিগর আর নেই। এখন কারিগরই নিজেকে মালিক মনে করে। সুযোগ পেলেই মালিককে ঠকানোর চেষ্টা করে।’
ফরিদুর রহমান জানেন, তাঁর পর হয়তো এই দোকানের দরজা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, একটি শিল্প শুধু কারিগরের হাতে বাঁচে না; প্রয়োজন উত্তরসূরি, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা। তাঁর সমসাময়িকরা সবাই চলে গেছেন। একাই বসে আছেন পুরোনো দোকানের সামনে—বেতের স্মৃতি পাহারা দিয়ে।






