বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভেঙে চার ইউনিয়ন নিয়ে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ‘মোকামতলা’ উপজেলা গঠন করে সরকার। এর দুই মাসের মাথায় আজ বুধবার মোকামতলা পৌরসভা গঠনের জন্য ১০টি গ্রামকে শহর ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর শাখা-২–এর উপসচিব আশফিকুন নাহার ২৩ জুন এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫৮ নম্বর আইন) এর ধারা ৩–এর উপধারা (১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বগুড়া জেলার মোকামতলা উপজেলার নিম্ন তফসিলে উল্লেখিত পল্লি এলাকাসমূহকে শহর এলাকা ঘোষণার অভিপ্রায় ব্যক্ত করল। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মৌজাসমূহ হলো ভাগকোলা, চকরামচন্দ্রপুর, কাশিপুর, লস্করপুর, লক্ষ্মীপুর, শঙ্করপুর, চাকলমা, মুরাদপুর, মালাহার ও চকপাড়া।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, উল্লেখিত আইনের ধারা ৩–এর উপধারা (৩) এর বিধান অনুযায়ী উল্লেখিত পল্লি এলাকাগুলোকে শহর এলাকা ঘোষণার অভিপ্রায় সংক্রান্ত এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার তারিখ থেকে অনূর্ধ্ব এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে লিখিত আপত্তি উত্থাপন করতে পারিবে এবং ধারা ৩ এর উপধারা (৪) এর বিধান মোতাবেক সরকার তিন মাসের মধ্যে আপত্তি নিষ্পন্ন করবে।
এর আগে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বন্দরকে নতুন উপজেলা ঘোষণা করা হয়। মোকামতলা, দেউলী, সৈয়দপুর, ময়দানহাট্টা এবং শিবগঞ্জ সদর নিয়ে এই উপজেলা গঠন করা হয়। ১১ জুন নতুন করে আরও তিনটি ইউনিয়ন গঠিত হওয়ায় এ সংখ্যা এখন ৮। উপজেলার আয়তন ১২৮ দশমিক ৭৪ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা প্রায় দেড় লাখের মতো।
এর মধ্যে গঠিত নতুন চারটি ইউনিয়নে নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’, ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ এবং ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’ নামে। প্রতিমন্ত্রীর বংশ ও পরিবারের সদস্যদের নামের সঙ্গে মিল রেখে এসব নামকরণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে তিনটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার (২৩ জুন) নিজ নিজ ইউনিয়নের আলাদা গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো এলাকাকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করতে হলে সাধারণত ওই এলাকায় ন্যূনতম ৫০ হাজার মানুষের বসবাস থাকতে হবে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে কমপক্ষে ২ হাজার মানুষের বসবাস থাকতে হবে। এলাকাটি শহর বা শহরতলির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে; অর্থাৎ অধিকাংশ জনগণ কৃষির বাইরে ব্যবসা, শিল্প, চাকরি বা অন্যান্য অকৃষি পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে। সাধারণভাবে মোট জমির অন্তত ৭০ শতাংশ অকৃষি কাজে ব্যবহৃত হতে হবে। কৃষিজমির পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। সড়ক, ড্রেনেজ, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা থাকতে হবে।
আইনানুযায়ী, পৌরসভা ঘোষণার চূড়ান্ত ক্ষমতা স্থানীয় সরকার বিভাগের। তারা মাঠপর্যায়ের তদন্ত, জনসংখ্যা, আয়, অবকাঠামো ও নগরায়ণের অবস্থা যাচাই করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে পৌরসভা ঘোষণা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেন, মোকামতলা একটি গ্রামীণ বন্দর। মহাসড়কের দুই পাশে কিছু দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বড় হাটবাজার নেই। ফলে রাজস্ব আয়ের তেমন উৎস নেই। প্রতি বর্গকিলোমিটারে দুই হাজার মানুষের বসবাস নেই এখানে। পুরোটা গ্রামীণ জনপদ। অধিকাংশ মানুষ এখানে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিজমির পরিমাণ এখানে সবচেয়ে বেশি। সড়ক, ড্রেনেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা এখানে নাজুক। সবেমাত্র উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। পৌরসভা গঠনের কোনো যোগ্যতা নেই এখানে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন ইসলাম তুহিন বলেন, এই মুহূর্তে সরকারকে অর্থনীতির নানা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বগুড়া উন্নয়নবঞ্চিত জেলা। সরকারের চার মাসেই বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় নতুন চারটি ইউনিয়নের নামকরণ এবং এক উপজেলায় অতিমাত্রায় উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হয়েছে। এতে সরকারও অনেকটা বিব্রত। মোকামতলা সবেমাত্র উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ আইনের শর্ত মেনে আরও পরে পৌরসভা গঠন করা হলে সরকারের বদনাম হবে না।
জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি মোকামতলাকে পৌরসভা ঘোষণা করা হোক। আইন অনুযায়ী, পৌরসভা ঘোষণার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে শহর ঘোষণা করতে হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতিমধ্যে মোকামতলা ইউনিয়নের ১০টি মৌজাকে শহর ঘোষণা করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কারও কোনো আপত্তি থাকলে এক মাসের মধ্যে তা লিখিতভাবে দিতে হবে। আপত্তি শুনানি ও নিষ্পত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।






