রাস্তাঘাট, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণ—সব জায়গায় আর্জেন্টাইনদের হাতে দেখা যাবে মাতে। আর্জেন্টাইন ফুটবলারদেরও প্রিয় এই মাতে। কাতার বিশ্বকাপে দলটি নিজেদের সঙ্গে নিয়েছিল মাতের ২৪০ কিলোগ্রাম কাঁচামাল।

.

বিছানায় আধশোয়া লিওনেল মেসি। একহাতে জড়িয়ে ধরা বিশ্বকাপ ট্রফি। অন্য হাতে বাদামি রঙের বিশেষ পাত্র। সেটিতে কোনো এক পানীয় পান করছেন মেসি। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টাইন তারকার এই ছবির কথা মনে আছে? মেসির হাতে থাকা পানীয়টি ছিল ‘ইয়ারবা মাতে’। এটিকে বলা হয় আর্জেন্টিনার ‘জাতীয় পানীয়’। রাস্তাঘাট, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণ—সব জায়গায় আর্জেন্টাইনদের হাতে দেখা যাবে মাতে। আর্জেন্টাইন ফুটবলারদেরও প্রিয় এই মাতে। কাতার বিশ্বকাপে দলটি নিজেদের সঙ্গে নিয়েছিল মাতের ২৪০ কিলোগ্রাম কাঁচামাল।

.

মাতে তৈরি হয় ইয়ারবা মাতে নামে একধরনের গাছের শুকনা পাতা থেকে। পাতাগুলো একটি বিশেষ পাত্রে নেওয়া হয়। পাত্রটিকেও বলা হয় মাতে। এটি ক্যালাবাজা (শুকনা লাউয়ের খোল), কাঠ, ধাতু, চামড়ায় মোড়ানো কাচ বা সিলিকন দিয়ে তৈরি করা হয়।
বিশেষ ওই পাত্রে নিয়ে শুকনা পাতায় গরম পানি ঢালা হয়। পানির তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে হালকা সবুজাভ রং আসে। এরপর বোম্বিয়া (ধাতব স্ট্র) দিয়ে তেতো এই পানীয়তে ধীরে ধীরে চুমুক দেওয়া হয়।
ইয়ারবা মাতে পাতা শুকানোর সময় ধোঁয়া ব্যবহার করা হয়। তাই এতে কিছুটা ধোঁয়াটে স্বাদও পাওয়া যায়। একবার পানি শেষ হয়ে গেলে আবার গরম পানি ঢালা হয়। লেবু ও কমলার খোসা, পুদিনাপাতা, চিনি, মধু, কফির গুঁড়া মিশিয়েও অনেকে মাতে পান করেন।

.মেসির স্ত্রী রোকুজ্জো বললেন, ‘বিশেষ মুহূর্তে মনে হয় মায়ের কোলে একটু মাথা রাখি’.

আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলে এই পানীয় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এ ছাড়া সিরিয়া ও লেবাননেও এর প্রচলন আছে। আজকাল মাতে শুধু পানীয়তে সীমাবদ্ধ নেই; পেস্ট্রি, আইসক্রিম, মিষ্টান্ন ও পিৎজায়ও ব্যবহার করা হয়।

.

দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী গুয়ারানিদের থেকে মাতে পান করার ঐতিহ্য এসেছে। বর্তমানে ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চল, আর্জেন্টিনার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও প্যারাগুয়েতে এই জনগোষ্ঠীর বসবাস। গুয়ারানিরা ভাগাভাগি করে মাতে পান করত। মাতেগাছের আধ্যাত্মিক শক্তিতেও বিশ্বাস আছে তাদের। গুয়ারানিরা মনে করত, একসঙ্গে মাতে পান করলে আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
এখনো মাতে ভাগাভাগি করে খাওয়ার চল আছে। সাধারণত একটি পাত্র থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি পালা করে মাতে পান করে। একজন পরিবেশনকারী থাকে। সে পানি ঢেলে অন্যদের হাতে দেয়। তারপর আবার নিজের কাছে ফেরত নেয়। এই সামাজিক রীতিকে বলা হয় ‘রোন্দা দে মাতে’। এখানে আছে কিছু নিয়মকানুন। পান করার সময় বোম্বিয়া স্পর্শ করা যাবে না। একজনকে এড়িয়ে অন্যজনকে পরিবেশন করা যাবে না। একই ব্যক্তি পরপর দুইবার মাতে নিতে পারবে না। ‘ধন্যবাদ’ বললে বুঝতে হবে সে আর পান করবে না।

.আর্জেন্টিনার মেসির স্ত্রী ব্যায়াম করেন ব্রাজিলের ট্রেইনারের কাছে.

মাতে কেবল ঐতিহ্যবাহী পানীয় নয়। এর আছে নানা উপকারিতা। মাতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ক্যাফেইন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাতে শারীরিক কর্মক্ষমতা ও শক্তি বৃদ্ধি এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

.

• মাতে কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমায়। এতে অল্প পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’, থায়ামিন (ভিটামিন বি১), রিবোফ্লাবিন (ভিটামিন বি২) ও ভিটামিন বি৬ আছে।

• মাতের প্রতি কাপে প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। ফলে এটি ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। মনোযোগ বাড়াতেও ভূমিকা রাখে এই পানীয়।

• ইয়েরবা মাতেতে মাঝারি মাত্রায় ক্যাফেইন থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন পেশি সংকোচন উন্নত করতে ভূমিকা রাখে, ক্লান্তি কমায় এবং খেলাধুলার পারফরম্যান্সে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

• ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাতের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য আছে। মাতে ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।

• মাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এটি পেটের চর্বি কমায়। শরীরের চর্বিযুক্ত কোষের সংখ্যা ও সেসবে জমা চর্বির পরিমাণ কমাতে ভূমিকা রাখে।

• মাতে রক্তে শর্করার মাত্রা কমায়। ডায়াবেটিসজনিত কিছু জটিলতা হ্রাস করতেও সাহায্য করে। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়।


সূত্র: আর্জেন্টিনা অন দ্য গো, বিবিসি, ইনডিপেনডেন্ট, হেলথলাইন

.সরাসরি মেসির খেলা দেখে কেমন অনুভূতি, জানালেন অভিনয়শিল্পী নাঈম–নাদিয়া, দেখুন ৯টি ছবিতে