কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার পেলের ক্যারিয়ার চমৎকার সব গল্পে ঠাসা। তবে সবচেয়ে মজার গল্পগুলোর একটি বিশ্বখ্যাত দুই ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস ও পুমার মালিক দুই ভাইয়ের তুমুল শত্রুতা নিয়ে। তাঁদের এই রেষারেষির কারণেই ১৯৭০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে শুধু নিজের বুটের ফিতা বাঁধার জন্য পেলে পেয়েছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার ডলার, ২০২৬ সালে যা ১০ লাখ ৩০ হাজার ডলারের মতো। শুনুন সেই গল্প।
.গল্পের শুরুটা জার্মানির দুই ভাইকে নিয়ে। ১৯২৮ সালে অ্যাডলফ ডাসলার ও রুডলফ ডাসলার মিলে ‘ডাসলার ব্রাদার্স শু ফ্যাক্টরি’ নামে একটি জুতার কোম্পানি খোলেন।
শুরু থেকে তাঁরা বেশ সফল ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর দুই ভাই আলাদা হয়ে যান। এরপর অ্যাডলফ তৈরি করেন ‘অ্যাডিডাস’ আর রুডলফ চালু করেন ‘পুমা’।
নিজেদের শহরে একে অপরের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও দুই ভাইই ব্যবসায় দারুণ উন্নতি করেন। অল্প দিনেই কোম্পানি দুটি বিশাল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।
এখনকার মতো সে সময়ও ব্র্যান্ড বড় করার জন্য নামী ক্রীড়াবিদদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করানো ছিল কার্যকর উপায়। দুই ভাই এই সুযোগ কাজে লাগান।
ঠিক তখন ফুটবল–দুনিয়ায় আগমন ঘটে প্রথম বিশ্ব তারকা পেলের। তখন অবস্থাটা এমন ছিল, যেকোনো ব্র্যান্ডই পেলেকে সঙ্গে রাখতে পারলে যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যায়।
.তবে পেলেকে নিয়ে কোনো ঝামেলা এড়াতে অ্যাডলফ ও রুডলফ ‘পেলে চুক্তি’ নামে একটি বিশেষ চুক্তি করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী ঠিক হয়, কোনো কোম্পানিই পেলেকে তাঁদের ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে নেবে না।
কারণ, তাঁরা জানতেন, পেলেকে দলে টানার জন্য যে টাকার লড়াই শুরু হবে, তাতে দুই কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন কথা রেখেছিলেন।
.১৯৭০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে পেলে হঠাৎ ঘোষণা দেন, তিনি পুমার সঙ্গে চুক্তি করেছেন। বিশ্বকে এই খবর জানানোর জন্য পুমা দারুণ এক বুদ্ধি খাটায়।
অ্যাডিডাসের সঙ্গে ‘পেলে চুক্তি’ করার পরও পুমা কথা রাখেনি। তারা গোপনে পেলের কাছে গিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের প্রস্তাব দেয়। শর্ত ছিল একদম সহজ।
.১৯৭০ সালের ১৪ জুন ছিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। ব্রাজিলের বিপক্ষে পেরু। ম্যাচ শুরু হবে হবে। ঠিক সে সময় মাঝমাঠে গিয়ে পেলে রেফারির কাছে কিছুটা সময় চাইলেন।
কেন? বুটের ফিতা বাঁধতে হবে।
ব্যস, পেলে মাঝমাঠে বসে বুটের ফিতা বাঁধতে লাগলেন, আর রাজ্যের সব ক্যামেরা তাক করা হলো পেলের ওই বুটের দিকে।
বলা হয়, পুমা সেদিন ক্যামেরাম্যানকেও আগে থেকে টাকা দিয়ে রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, পেলে যখন ফিতা বাঁধবেন, ক্যামেরা যেন জুম করে সেটি দেখায়।
যেমন কথা তেমন কাজ। ম্যাচ শুরু হওয়ার মুহূর্তেই সারা বিশ্বের মানুষ দেখল পেলের পায়ে পুমার বুট।
রুডলফের চুক্তিভঙ্গের কাণ্ড দেখে অ্যাডলফ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়লেন। দুই ভাইয়ের পুরোনো শত্রুতা পেল নতুন মাত্রা।
.পেলের এই ‘বিজ্ঞাপনে’ পুমা বাজিমাত করল। বিক্রি বাড়ল রেকর্ড পরিমাণে। ওদিকে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক আরও তিক্ত হলো। তবে দিন শেষে লাভ হলো পুমা ও পেলের।
পেলে ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সাল)। এর মধ্যে ১৯৫৮ সালের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। যেখানে ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে দুটি অসাধারণ গোলও করেছিলেন।
.অর্থাৎ মাঠ ও মাঠের বাইরে পেলের জনপ্রিয়তা যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখন তাঁর মতো বিশ্বসেরাকে নিজেদের দলে টেনে পুমা রাতারাতি বাজারের অন্যতম ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
.এত বছর পরও অ্যাডলফ ও রুডলফের পারিবারিক বিবাদ শেষ হয়নি। তাঁদের এই শত্রুতার প্রভাব এখনো তাঁদের নিজ শহর জার্মানির হার্জোগেনাউরাখে রয়ে গেছে।
অ্যাডিডাস ও পুমার বিরোধে শহরের সাধারণ মানুষও দুই ভাগে বিভক্ত। এমনকি কোনো কোনো দোকানদার গায়ের পোশাক বা পায়ের জুতার ব্র্যান্ড দেখে ক্রেতাকে ‘বিচার’ করে এবং সেটা বুঝেই জিনিসপত্র বিক্রি করে।
তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই লোকসান বা ক্ষতি হয়নি। পেলে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ফুটবল ইতিহাসে সেরাদের একজন। আর অ্যাডিডাস ও পুমাও এখন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড।
সূত্র: ওয়ানফুটবল, দ্য সান
.বিশ্বকাপে নানা দেশের সমর্থকদের সাজ, দেখুন ছবিতে





