ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, রাষ্ট্র বা সরকারের স্বার্থে নয়, বরং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা উচিত। এ দেশে কখনো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, কখনো সরকারের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন হয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘মেকিং অ্যান্ড আনমেকিং: আ স্টাডি অব অ্যামেন্ডমেন্টস টু দ্য বাংলাদেশ কনস্টিটিউশনস’ শিরোনামের এই সেমিনার আয়োজন করেন ঢাবির ইতিহাস বিভাগ ও বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি।

উপাচার্য বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে সেই সংস্কার টেকসই হবে এবং জাতি উপকৃত হবে। তিনি আরও বলেন, মাঝেমধ্যে রাষ্ট্রের বাহাদুরির জন্য সংবিধান পরিবর্তিত হয়। সংবিধানে যৌক্তিক সংশোধন করেছিলেন জিয়াউর রহমান, এরপর করেছিলেন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে যেন আর রাজপথে নামতে না হয়, এমন পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আহমেদ আবদুল্লাহ জামালের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক। প্রবন্ধকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আজরিন আফরিন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এস এম রেজাউল করিম। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আবুল কালাম সরকার ও ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আশফাক হোসেন।

মূল প্রবন্ধে শাহদীন মালিক বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গণতন্ত্র, ক্ষমতার ভারসাম্য ও নাগরিক অধিকারের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, “সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।”

শাহদীন মালিক আরও বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রয়োজনে বাংলাদেশের সংবিধান বারবার সংশোধিত হয়েছে; কিন্তু প্রতিটি সংশোধনী যে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, তা নয়। কিছু সংশোধনী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে, আবার কিছু সংশোধনী নাগরিক অধিকারের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

একটি কার্যকর ও টেকসই সংবিধানের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জনগণের আকাঙ্ক্ষার দলিল হিসেবে দেখতে হবে। ভবিষ্যতের যেকোনো সংবিধান সংস্কার হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, গণমুখী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধনির্ভর।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, “ইতিহাস ছাড়া আমাদের চলার সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নিজেদের প্রয়োজনে ইতিহাস বিকৃত করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।”

স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক এস এম রেজাউল করিম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন। সংবিধানের সংশোধনীগুলোকে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের দৃষ্টিতে না দেখে এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি ও সমালোচনামূলক চিন্তার জায়গা। তাই এই সেমিনারের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।