অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বেনারসি কাপড়ের পোশাক পরে হাজির হয়েছিলেন। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার উদ্দেশ্যেই তিনি দেশি কাপড়ের এই পোশাকগুলো বেছে নিয়েছিলেন। মস্কো থেকে ফিরে নকশার আয়োজনে আবারও সেই পোশাকগুলো পরে পাঠকদের দেখিয়েছেন।
বেনারসি সাধারণত কনের শাড়ি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই কাপড় দিয়ে ভিন্ন ধরনের পোশাকও তৈরি করা যায়, তা প্রমাণ করেছেন ভাবনা। তাঁর অভিনীত নতুন ছবি কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস নিয়ে উৎসবে যোগ দেন ভাবনা। সেখানে আধুনিক আঙ্গিকে বেনারসির পোশাক তুলে ধরেন তিনি। ভাবনার পোশাক দেখে অনেকে জানতে চেয়েছেন, এগুলো কোথায় তৈরি হয়েছে? ভাবনা বললেন, “এটাই আমি চেয়েছিলাম, আমার পোশাক দিয়েই যেন আমার দেশ ও সংস্কৃতির পরিচয় মেলে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে।”
ভাবনা বলেন, “বাংলাদেশের শিল্পীরা যখন বাইরে যান, তখন আর নামে পরিচিত হন না, হয়ে যান বাংলাদেশি। এ কারণেই আমরা দেশের বাইরে নিজেদের সংস্কৃতিকে কীভাবে উপস্থাপন করছি, সেই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।” সবাই সাধারণত বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডের পোশাক পরতে পছন্দ করেন। কিন্তু ভাবনা ভেবেছিলেন, “এমন কিছু পরব, যা আমার দেশকে উপস্থাপন করবে, আবার আন্তর্জাতিক ফ্যাশনধারাকেও তুলে ধরবে।” তাই বেনারসি বেছে নেন তিনি।
ছবির প্রিমিয়ারের দিন গোলাপি রঙের স্কার্ট ও টপ পরেছিলেন ভাবনা। কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস ছবির শিরোনাম থেকে ‘প্রিন্সেস’ শব্দটিকে গুরুত্ব দিয়ে এই গোলাপি পোশাক তৈরি হয়। নিজেকে প্রিন্সেসের মতো লেগেছিল, জানালেন ভাবনা। টপটি ডিজাইন করেছেন ইমাম হাসান, আর নিচের অংশ তন্বী কবির। ইমাম হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গোলাপি কাপড়ের বাইরে সোনালি অংশটি আসলে সোনালি দড়ি। ১৫ থেকে ১৬ গজ দড়ি ব্যবহার করে এটি তৈরি। দড়ির ওপর কাতান থেকে নেওয়া বিভিন্ন মোটিফ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ব্লাউজের সামনে প্লিট দেওয়া, পেছনে অরগাঞ্জা কাপড়ের লম্বা ট্রেইন যুক্ত ছিল।
ভাবনার পোশাকগুলো তৈরি করেছেন ফ্যাশন হাউস ‘ক্যানভাস’-এর ডিজাইনার ও মালিক তন্বী কবির। চারটি পোশাকের জন্য মাত্র ১৫ দিন সময় ছিল। তন্বী বলেন, “দেশের বাইরে গেলে অনেকে জামদানি পরেন। কিন্তু ভাবনা একটু ভিন্ন পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। তিনি বেনারসি নির্বাচন করেন।” কোথায় কখন পরা হবে, আবহাওয়া—সব মাথায় রেখে পোশাক তৈরি করেছেন তন্বী।
উৎসবের প্রথম দিন সোনালি-জলপাই রঙের কাতান করসেট গাউন পরেন ভাবনা। তিনি বলছিলেন, “পোশাকটি পরার পর সবাই মনে করছিলেন আমি ভুটানের রানি। পোশাকের কাটিং, মেকআপ, চুলের স্টাইল—সবকিছুতে ছিল রাজকীয় ভাব। আমাকে সেইভাবে সম্মানও দিচ্ছিলেন সবাই। ছবি তুলছিলেন, সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন।” প্রথমে জ্যাকেট ছিল না, পরে ঠান্ডার কথা ভেবে তন্বী বানিয়ে দেন। শুরুতে অন্য পোশাক পরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মস্কো যাওয়ার আগের রাতে ভাবনা সেটা বাতিল করেন। রাত ১২টা থেকে তন্বীর দল নতুন করে কাজ শুরু করে ভোর ৪টায় পোশাক প্রস্তুত হয়।
উৎসবের শেষ দিন সবুজ বেনারসি শাড়ি পরেছিলেন ভাবনা। বাংলাদেশের পতাকা থেকে উদ্ভূত হয়ে সবুজ রঙ বেছে নেন। লাল গালিচায় এটি দেশীয় অনুভূতির ঝলক দিয়েছিল। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজে আলাদা করে যুক্ত গয়না নজর কাড়ে। ব্লাউজটিও ইমাম হাসানের নকশা। শাড়ি থেকে নেওয়া মোটিফ জারদৌসি ও ধাতব বিডস দিয়ে তৈরি। এই দুটো টপ বানাতে পাঁচ-ছয় দিন সময় লেগেছে।
পাঁচটি স্যুটকেসে পোশাক নিয়ে গিয়েছিলেন ভাবনা। সঙ্গে মেকআপ আর্টিস্ট বা সহায়তাকারী ছিলেন না। মস্কোতে একাই সেজে, পোশাক পরে, ছবি তোলা থেকে সাক্ষাৎকার দেওয়া—সব সামলান। দেশের সংস্কৃতি তুলে ধরার আনন্দে সব কষ্ট ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছিল।
কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস মস্কো উৎসবের আর্টকোর বিভাগে নির্বাচিত হয়েছিল। যাত্রাশিল্পের আবহে নির্মিত এই ছবি এক প্রিন্সেসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সেই প্রিন্সেস চরিত্রে অভিনয় করেছেন আশনা হাবিব ভাবনা।






