বিনোদন জগতে এক যুগেরও বেশি সময় কাজ করে এসেছেন জিয়াউল হক পলাশ। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় পরিচালকের সহকারী হিসেবে। পরবর্তীতে একক ও ধারাবাহিক নাটক এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অভিনয় করেন তিনি। ধীরে ধীরে অভিনয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

২০১৮ সালে শহুরে মেস জীবনের নানা টানাপোড়েন, হাসি-কান্না নিয়ে প্রচার শুরু হওয়া ধারাবাহিক নাটক ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এ অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন জিয়াউল হক পলাশ। এই নাটকের জন্য ‘কাবিলা’ নামেই এখন তাঁর পরিচিতি বেশি।

মডেল ও পরিচালক হিসেবে জিয়াউল হক পলাশের কৃতিত্বের জন্য তাঁর মা ফাতেমা আক্তারকে ‘গরবিনী মা’ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে আজ রোববার মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে এই সম্মাননা প্রদান করা হয় তাঁকে। মায়েদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১১ মাকে এই সম্মাননা দেয় রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

জিয়াউল হক পলাশের পরিবারের কেউ কখনো বিনোদন জগতে কাজ করেননি। বাবা মুজিবুল হক চাইতেন ছেলেও তাঁর মতো প্রকৌশলী হোক। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে।

কিন্তু পলাশের মন ছিল বিনোদন জগতের দিকে। নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়েন তিনি। এসএসসিতে প্রথমবার পাস করতে পারেননি। এই ধাক্কা সইতে না পেরে স্ট্রোক করে ১৫ দিন অচেতন ছিলেন তাঁর মা ফাতেমা আক্তার।

আজ রোববার ‘গরবিনী মা’ সম্মাননা পেয়ে তিনি মুক্তকণ্ঠকে সেই কষ্টের স্মৃতি শেয়ার করেন। ফাতেমা আক্তার বলেন, “১৫ দিন পরে আমার জ্ঞান ফিরেছিল। অনেক থেরাপি দিতে হয়েছে।”

মায়ের সেই কষ্টের কথা স্মরণ করে অনুষ্ঠানে পলাশ বলেন, “আম্মার বাঁ হাত, বাঁ পা এবং বাঁ চোখ সব প্যারালাইজড (অবশ) ছিল। কথা বলতে পারত না আম্মা। লিখে লিখে কথা বলতে হতো।”

জিয়াউল হক পলাশের মা ফাতেমা আক্তার জানান, ছেলে যখন নির্মাতা হওয়ার কথা বলত, তখন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তেন। কারণ, তিনি চাইতেন ছেলে চিকিৎসক অথবা প্রকৌশলী হবে। নির্মাতা হবে এমনটা কখনো ভাবেননি।

ফাতেমা আক্তার বলেন, “ক্লাস নাইন থেকে সে মিডিয়ার পেছনে পড়ে। এ কারণে এসএসসিতে অকৃতকার্য হয়। তাকে নিয়ে সব সময় একটা কষ্ট থাকত। সব সময় কান্না আসত।”

তবে শুধু হতাশা ছিল না। ফাতেমা আক্তার জানান, বিনোদন জগতে প্রবেশের পর ছেলে যখন লম্বা সময় ঘরের বাইরে থাকত, তখন তিনিই ছিলেন নীরব সঙ্গী। ছেলে বাইরে কী খায়, কীভাবে সময় কাটায়—এসব ভেবে লুকিয়ে টাকা গুঁজে দিতেন পলাশের হাতে।

কেন টাকা দিতেন জানতে চাইলে পলাশের মা বলেন, “মনে করতাম বাইরে বাইরে থাকে, কী খায়, কী না খায়—এ জন্যই দিতাম।”

জিয়াউল হক পলাশের সাফল্যের পেছনে ছেলের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বলে মনে করেন ফাতেমা আক্তার। তিনি বলেন, এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পলাশ কিছু একটা করে দেখাবে—এমন জেদ মনে ধরে। এই জেদই তাঁকে এতদূর নিয়ে এসেছে।

ফাতেমা আক্তার জানান, ছেলে অকৃতকার্য হওয়ার পর সমাজের বাঁকা দৃষ্টি তাঁকে বেশি কষ্ট দিত। পরের বছর এসএসসি পরীক্ষায় পলাশকে নিয়ে যাওয়ার সময় স্কুলের সবাই তাঁকে এড়িয়ে যেত। যাঁরা আগে ভালোবাসতেন, হাসিমুখে কথা বলতে চাইতেন, তাঁরা বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতেন।

পলাশের দ্বিতীয়বার পরীক্ষার তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি এক কোণে বসে থাকতাম ও যখন পরীক্ষা দিতে যেত।”

ফাতেমা আক্তার এখন মনে করেন, সন্তানেরা যা করতে পছন্দ করে, সেই কাজে সন্তানকে সমর্থন দেওয়াই বাবা-মায়ের উচিত। সন্তানের এগিয়ে যাওয়ার পর এটাই তাঁর অভিমত। সব বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি সহযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “বাধা দেওয়ার চেয়ে সন্তানের কাজে উৎসাহ দেবেন, দেখবেন একদিন ভালো কিছু করবে।”

জিয়াউল হক পলাশও মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়েদের প্রতি সম্মান জানান। যে মায়েরা কখনো আলোচনায় আসতে পারেননি, কোনো খবরে আসেননি, সেই মায়েদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা জানান।