রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে আমরা তা রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া বলে জানি, যা সকলের কাছে পরিচিত। কিন্তু হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্তকণিকা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে গেলেও শরীরের জন্য তা ক্ষতিকর। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘পলিসাইথেমিয়া’ বলা হয়, যা রক্তস্বল্পতার সম্পূর্ণ উল্টো。

সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় (সিবিসি) পুরুষদের হিমোগ্লোবিন ১৭ দশমিক ৫ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ১৫ দশমিক ৫ গ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি হলে পলিসাইথেমিয়া নির্ণয় করা হয়।

এই সমস্যা মূলত তিন রকমের হতে পারে—

  • প্রাইমারি পলিসাইথেমিয়া বা পলিসাইথেমিয়া ভেরা: এটি অস্থিমজ্জার রোগ। এখানে রক্ত তৈরির কারখানা বা স্টেম সেল ত্রুটিপূর্ণ হয়ে অস্বাভাবিক হারে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন করে।
  • সেকেন্ডারি পলিসাইথেমিয়া: শরীরের অন্য সমস্যা যেমন দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ বা সিওপিডি, হার্টের জন্মগত ফুটো বা কিডনির টিউমারের কারণে রক্তকণিকা বেড়ে যায়।
  • রিলেটিভ পলিসাইথেমিয়া: এখানে রক্তকোষ আসলে বাড়ে না, তবে শরীরের জলীয় অংশ বা প্লাজমা কমে যাওয়ায় রক্ত ঘন মনে হয়। অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ডিহাইড্রেশন এর কারণ হতে পারে। অনেক খেলোয়াড় বা অ্যাথলেট পারফরম্যান্স বাড়াতে ওষুধ খেয়ে হিমোগ্লোবিন অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে পারেন। পাহাড়ি এলাকার মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক।

রক্তের ঘনত্ব বাড়লে সরু রক্তনালি দিয়ে তা সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না, ফলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন—

  • অতিরিক্ত মাথা ব্যথা, ঝিমঝিম বা মাথা ঘোরা।
  • দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া।
  • তীব্র চুলকানি, বিশেষ করে কুসুম গরম পানিতে গোসলের পর।
  • শ্বাসকষ্ট এবং শরীরের গিঁটে ব্যথা।
  • ত্বকের রং পরিবর্তন: ফরসা মানুষের গায়ে লালচে ভাব, এশীয়দের ক্ষেত্রে কালচে দেখা। উচ্চ রক্তচাপ এবং লিভার বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া।

সময়মতো চিকিৎসা না হলে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তনালি বন্ধ হতে পারে। এর ফলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক, পেটের রক্তনালিতে ব্লক হয়ে মারাত্মক ব্যথা বা দীর্ঘমেয়াদে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে রক্তে ক্যানসার, লিউকোমিয়া, মজ্জার জটিলতা বা মাইলোফাইব্রোসিস হতে পারে।

সিবিসি এবং পিসিভি হিমাটোক্রিটের মাত্রা দেখে প্রাথমিকভাবে রোগ ধরা যায়। পরে কারণ নিশ্চিত করতে বোন ম্যারো বা জিনের মিউটেশন পরীক্ষা করা হয়।

প্রধান চিকিৎসা ভেনিসেকশন: রক্তদানের মতো শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত বের করে ফেলা হয়, যাতে ঘনত্ব কমে এবং রোগী আরাম পান। এ রক্ত অন্যকে দেওয়া যায় না। রক্ত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে ‘হাইড্রোক্সিইউরিয়া’ বা ‘রুক্সলিটিনিব’ ওষুধ দেওয়া হয়। রক্ত জমাট বাঁধা রোধে অল্প অ্যাসপিরিন দেওয়া হয়। পলিসাইথেমিয়া মানেই ক্যানসার নয়। নিয়মিত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রোগীরা সাধারণ মানুষের মতো দীর্ঘ সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন। নিয়মিত মাথা ব্যথা, ত্বক কালচে বা চেকআপে হিমোগ্লোবিন বেশি পেলে মেডিসিন বা হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

লেখক: জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।