ট্যাপের এক গ্লাস পরিষ্কার পানির ভিতরেও মাইক্রোপ্লাস্টিক লুকিয়ে থাকতে পারে। এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিককণা বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। মহাসাগরের গভীরতম স্তর থেকে শুরু করে মানুষের রক্তনালী ও মস্তিষ্ক পর্যন্ত এটি পৌঁছে গেছে। তবে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার এই সমস্যার সমাধানে নতুন আশা জাগিয়েছে। আমাদের পরিচিত শজনের বীজ এর কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞানীদের মতে, শজনের বীজ ট্যাপের পানি থেকে ৯৮ শতাংশের বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে সক্ষম।

প্লাস্টিক দূষণ আধুনিক যুগের বড় সমস্যা। প্লাস্টিক ভেঙে অতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট যে ১ ইঞ্চির ২৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে চোখে দেখা অসম্ভব।

২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে পরীক্ষা করা ট্যাপের পানির প্রায় ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আছে। অর্থাৎ প্রতিদিন পানির সঙ্গে এই প্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে।

এগুলো শরীরের মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও রক্তনালীতে মারাত্মক ক্ষতি করে। প্রাণীদেহে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্লাস্টিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রজননগত সমস্যা সৃষ্টি করে।

শজনের গাছ বিশ্বজুড়ে ‘মিরাকল ট্রি’ নামে পরিচিত। এর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণাবলীর জন্য এটি বিখ্যাত। তবে গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের বিজ্ঞানীরা এর আরেক বিস্ময়কর ক্ষমতা প্রকাশ করেছেন।

ব্রাজিলের সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনকালভেস দস রেইস জানান, প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পানি বিশুদ্ধ করতে এই গাছ ব্যবহার করে আসছে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয়রাও পানি পরিষ্কার করার জন্য শজনের বীজ ব্যবহার করত। এক দশক ধরে তাঁর দল এই বীজ নিয়ে গবেষণা করছে।

এই বীজগুলো পানিতে জমাট বাঁধার উপাদান হিসেবে কাজ করে। পানির ভেতরে ভাসমান অতিক্ষুদ্র কণাগুলোকে বীজের নির্যাস আঠার মতো আটকে দেয়। ফলে কণাগুলো ভারী হয়ে নিচে জমে যায় এবং সহজে ফিল্টার করা যায়।

গবেষকেরা তাঁদের পরীক্ষায় সবচেয়ে ক্ষতিকর পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা খাওয়ার পানিতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাঁরা ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো পানিতে শজনের বীজের নির্যাস ব্যবহার করেন।

এখানে জানিয়ে রাখি, ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার মানে মানুষের একটি চুলের গড় পুরুত্বের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। যাহোক, ফিলট্রেশন সিস্টেমে এই নির্যাস ট্যাপের পানি থেকে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে সফল হয়।

পানি পরিষ্কার করতে সাধারণত ফিটকিরি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, শজনের বীজের কার্যক্ষমতা এই ফিটকিরির প্রায় সমান। আর ক্ষারীয় পানিতে এটি ফিটকিরির চেয়ে বেশি কার্যকর।

শজনের বীজ ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং কোনো ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি করে না। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম বেশি মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে তা বিষাক্ত হতে পারে এবং এটি স্নায়বিক রোগের কারণ হিসেবেও পরিচিত।

ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন এ প্রসঙ্গে বলেন, অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টারের বদলে প্রাকৃতিক এই উপাদানের ব্যবহার একটি সস্তা ও টেকসই সমাধান দিতে পারে। এটি পরিবেশ ধ্বংসকারী অ্যালুমিনিয়াম খনির প্রয়োজনীয়তাও কমিয়ে আনবে।

তবে এ প্রক্রিয়ার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটি শজনের বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি পরিষ্কার করা যায়। ছোট এলাকা বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি দারুণ কার্যকর হলেও বড় বড় শহরের কোটি কোটি লিটার পানি পরিষ্কার করার জন্য অনেক বীজ প্রয়োজন।

এ ছাড়া বীজ বেশি ব্যবহার করলে পানিতে জৈব বর্জ্য থেকে যেতে পারে, যা আলাদা করে অপসারণ করার প্রয়োজন পড়বে।

বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন পদ্ধতিটি কতটা সাশ্রয়ী করা যায়, তা নিয়ে। পাশাপাশি মানুষের চুলের হাজার ভাগের এক ভাগ আকারের ন্যানোপ্লাস্টিক দূর করতে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা-ও পরীক্ষা করে দেখছেন।

পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে এবং আগামী কয়েক দশক এই প্রবণতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে শজনের বীজের মতো প্রাকৃতিক ও সহজলভ্য সমাধান জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: সিএনএন