মুম্বাই ভ্রমণে এলিফান্টা দ্বীপ না ঘুরলে তো কথাই নেই! আরব সাগরের মাঝে মুম্বাই উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপে পাহাড় কেটে তৈরি অসংখ্য গুহা। এসব গুহার দেওয়ালে পাথর কুঁদে দেব-দেবীর মূর্তি বের করা হয়েছে। লঞ্চ ভাড়া করে মুম্বাই থেকে এসে পর্যটকরা এখানকার গুহাগুলো ঘুরে দেখেন।

‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’র কাছাকাছি উপকূল থেকে ছাড়ে লঞ্চগুলো। কলোবা এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক তোরণ ভারতের জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানি মেরি সমুদ্রপথে ভারতে আগমন করে প্রথম এখানেই পা রাখেন। পরবর্তীতে ২৬ মিটার উঁচু ‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’ নির্মিত হয়, যার উদ্বোধন ঘটে ১৯২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর।

এক সকালে গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ার সামনে পৌঁছে আমরা এলিফান্টার জন্য ২৫০ রুপির যাওয়া-আসার টিকিট কিনলাম। সোমবার বাদে সপ্তাহের অন্য ছয় দিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এসব গুহা। সোমবার বন্ধ থাকে। ইন্ডিয়া গেট থেকে এলিফান্টায় পৌঁছাতে লাগে সোয়া এক ঘণ্টা।

টিকিট দেখিয়ে লঞ্চে উঠলাম। ছাদে বসতে হয় ১০ রুপি অতিরিক্ত। কিছুটা যাওয়ার পর প্রচণ্ড ঢেউ লঞ্চে আছড়াতে শুরু করল। ঢেউয়ের ওপর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল লঞ্চ। ঢেউ দেখে ভয়ে আঁতকে উঠলাম, খালি ভাবছিলাম কেন লঞ্চে উঠলাম। ঈশ্বরের নাম জপতে জপতেই দ্বীপের ঘাটে লঞ্চ এসে ভিড়ল। পাশেই সবুজে ভরা ছোট্ট এক পাহাড়।

লঞ্চ থেকে নেমে টয় ট্রেন ধরলাম। সামান্য পথ হেঁটেই যাওয়া যায়, তবু অভিজ্ঞতার জন্য ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন গুহার কাছের গেটে নামিয়ে দিল। পাহাড় বেয়ে হেঁটে গুহার দিকে এগোলাম। পথের দু’পাশে হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, খাবারের দোকান ও নানা পণ্যের দোকান। এসব দেখতে দেখতে গুহার মুখে পৌঁছে গেলাম।

এলিফান্টায় রয়েছে পাঁচটি হিন্দু দেব-দেবীর ও দুটি বৌদ্ধ গুহা, কয়েকটি বৌদ্ধ স্তূপ ও ঢিবি। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে পাহাড়ের পাথর কেটে এসব গুহা তৈরি। শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত বড় গুহাটি ৩৯ মিটার দীর্ঘ। ১৯৮৭ সালে ইউনেসকো এলিফান্টাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

সমুদ্রপথে ব্যবসায় আসা পর্তুগিজরা দ্বীপটি আবিষ্কার করেন। তখন এখানে দুটি বিশাল পাথরের হাতির মূর্তি ছিল। বন্দুক চালানো শেখার জন্য একটি হাতি নষ্ট হয়, অন্যটি দুই ভাগ। ভগ্ন হাতিটি মেরামত করে মুম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়া গার্ডেনে স্থাপিত। এই হাতির নামে পর্তুগিজরা দ্বীপের নামকরণ করেন এলিফান্টা। প্রতি বছর ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি এখানে এলিফান্টা উৎসব উদযাপিত হয়।

দ্বীপে যাওয়ার পথে দেখা যায় সমুদ্রে ভারতের তেল উত্তোলন কেন্দ্র ও পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র। তবে পর্যটকদের সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। এলিফান্টা ঘুরে লঞ্চে করে গেটওয়ে অব ইন্ডিয়ায় ফিরলাম। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন গাড়ির চালক চন্দ্রপ্রকাশ উপাধ্যায়। বললেন, হাতে সময় আছে, চলুন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত পীর হাজি আলীর দরগা ঘুরে আসি। আমরা গাড়িতে উঠলাম।

গাড়ি এসে থামল সমুদ্রের আরেক উপকূলে। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ওরলি উপকূল থেকে ৫০০ মিটার দূরে আরব সাগরের বুকে এই দরগা। একটা সরু পথ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, জোয়ারে পথ ডুবে যায়। গাড়ি থেকে নেমে সেই পথ ধরে দরগায় এগোলাম। দরগায় ঢোকার লম্বা লাইন। সমুদ্রতীরের সড়কে প্রচুর দোকানপাট, বিশেষ করে মাজারে চড়ানোর চাদরের দোকান। কে কম দামে চাদর বিক্রি করবে তার প্রতিযোগিতা চলছে। ধীরে ধীরে দরগায় ঢুকলাম। ভেতরে প্রচণ্ড ভিড়, ভক্তরা মাজারে চাদর চাড়ছেন।

হাজি আলী শাহ বুখারি ছিলেন আফগান। ইসলাম প্রচারের জন্য আফগানিস্তান থেকে এখানে আসেন। তাঁর স্মৃতিতে ১৪৩১ সালে দরগা নির্মিত হয়। এখন হাজি আলী দরগাহ ট্রাস্ট এর দেখভাল করে। প্রতিদিন হাজারো ভক্ত আসেন, ঈদ কোরবানিতে ভিড় আরও বাড়ে, দীর্ঘ লাইন পড়ে।

দরগা চত্বরে ইন্দো-ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর বিশাল মসজিদ রয়েছে। এখানে হাজারো মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন।

ঢাকার কাছেই সবুজে ঘেরা এক আধুনিক গ্রাম, পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও