ভোলায় জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত মৎস্য ভিজিএফ চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে তালিকা তৈরিতে জটিলতা দেখা দিলেও অবরোধের ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও জেলার ৭২টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভার অনেক এলাকায় জেলেরা এখনো চাল পাননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেলে লালমোহন উপজেলায় শতাধিক জেলে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন। অন্যদিকে, চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকা ইউনিয়নে জেলে কার্ডের তালিকা নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনারা বেগম ও তাঁর স্বামী আবুল কালাম ফরাজী আহত হন।
ইউনিয়ন পরিষদের সূত্রে জানা গেছে, চর মানিকা ইউনিয়নে ১ হাজার ২০০ জেলের জন্য চার মাসে (মার্চ-জুন) ৪০ কেজি করে মোট ১৯২ টন চাল বরাদ্দ করা হয়। প্রথম দফায় দুই মাসের জন্য ৯৬ টন চাল উত্তোলন হয় এবং তালিকা তৈরি শুরু করা হয়। কার্ডধারী ১ হাজার ২০০ জেলের মধ্যে প্রকৃত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ২০০। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জেলেকে প্রথম দুই মাসে এবং বাকিদের পরবর্তী দুই মাসে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। নিয়ম অনুসারে, ১ হাজার ২০০ জেলে ৪ মাসে মোট ১৬০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা।
জানা গেছে, ইউনিয়ন বিএনপির নেতারা তাঁদের তালিকা অনুযায়ী প্রথম দুই মাসের ৯৬ টন চাল বিতরণের দাবি জানান। অভিযোগ আছে, প্রকৃত জেলেদের নাম বাদ দিয়ে বিএনপির কর্মীদের (যাঁরা অন্য পেশার) নাম তালিকায় নেওয়ার চেষ্টায় উত্তেজনা ছড়ায়।
গতকাল শুক্রবার রাত আটটার দিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কক্ষে তালিকা নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান (মোস্তাফিজ মেম্বার), দক্ষিণ আইচা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু তাহের (তাহের মাস্টার), বিএনপি নেতা আবদুল মান্নান হাওলাদার, ইউনিয়নের সচিব মো. ইয়ামিন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনারা বেগম ও তাঁর স্বামী আবুল কালাম ফরাজী উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির নেতারা তাঁদের তালিকা মেনে চাল বিতরণের চাপ দিলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা বৈঠক ত্যাগ করেন। চেয়ারম্যান ও তাঁর স্বামী পরিষদ থেকে বের হলে তাঁদের ওপর হামলা হয়। তাঁদের পিটিয়ে আহত করা হয় এবং মুঠোফোন নষ্ট ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামে।
দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
ইউনিয়নের সচিব মো. ইয়ামিন বলেন, ‘দলীয় নেতারা তালিকা প্রণয়ন করার কারণে চাল বিতরণে বিলম্ব হচ্ছে। এ দলীয় নেতাদের বাধার মুখে আমরা সঠিকভাবে চাল বিতরণ করতে পারছি না। একজন জেলে ১৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু এখন এক জেলেকে ৪০ কেজি চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনারা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রকৃত জেলেদের নিয়ে তালিকা করতে বলেছিলাম। কিন্তু বিএনপি নেতারা জেলেদের নাম বাদ দিয়ে বিএনপির কর্মীদের নামের তালিকা করেছেন। আমি তালিকাটি ইউএনওকে দেখিয়ে অনুমোদনের কথা বলেছিলাম। ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতারা এ কারণে আমাদের ওপর হামলা করেছেন। পিটিয়ে আহত ও মুঠোফোন, মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছেন। আমরা ঘটনাটি ইউএনওকে জানিয়েছি। আমরা আইনের আশ্রয় চাই।’
তবে দক্ষিণ আইচা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু তাহের চেয়ারম্যানের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা আমাদের তালিকায় জেলেদের বাইরে কারও নাম আনিনি। এই তালিকা কয়েক দিন আগে চেয়ারম্যান ও সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তার স্বামী নানা বাহানায় চাল বিতরণে বিলম্ব করছে। এ কারণে জেলেরা বিক্ষোভ করেছে। যার রোষানলে পড়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও তার স্বামী।’
এদিকে, লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের পাটাওয়ারীর হাটসংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরবর্তী কোবখালী মাছঘাটের জেলেরা চালের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান চাল বিতরণে গড়িমসি করছেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য অফিস কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।
চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান জানিয়েছেন, জেলে কার্ডের তালিকা নিয়ে জটিলতার কারণে চাল বিতরণ বিলম্বিত হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত হলেই কার্ড যাচাই করে চাল বিতরণ করা হবে। লালমোহন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলী আহমেদ আখন্দ বলেন, ঈদের আগেই চাল বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র (ডিও) হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের জটিলতার কারণে সমস্যা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক বলেন, তালিকা প্রস্তুতে বিলম্ব হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। দ্রুতই জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ করা হবে। ভোলা জেলা প্রশাসক মো. শামীম রহমান বলেন, দ্রুত তালিকা করে চাল বিতরণ শুরু করা হবে।






