ঢাকার কাছাকাছি প্রকৃতির কোলে সময় কাটানোর জায়গাগুলোর মধ্যে জিন্দা পার্কের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে। এখানকার প্রাঙ্গণে চোখজুড়ানো সবুজের সমারোহ মনকে প্রশান্ত করে। সবুজ অরণ্যে ঘেরা এই জায়গায় রয়েছে গ্রামীণ আবহ, স্কুল, খেলার মাঠ, মসজিদ, ঈদগাহ, রেস্তোরাঁ, রেস্টহাউস, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ আরও অনেক সুবিধা।
কাঁচপুর ব্রিজ থেকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা গাউছিয়া হয়ে কাঞ্চন ব্রিজে যান। কাঞ্চন ব্রিজ থেকে অটোরিকশায় উঠলে সৌভাগ্যক্রমে একজন অঘোষিত ভ্রমণ গাইডও পাওয়া যায়। নেযামুল হাসান পড়ছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে। বলছিলেন, “প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পুরো স্কুলজীবনই কেটেছে জিন্দা পার্কের স্কুলে। বলা যায়, ছোট থেকে বড়ই হয়েছি এখানে।” অটোরিকশা থেকে নেমে হেঁটে জিন্দা পার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দেন নেযামুল হাসান। প্রবেশের টিকিট মূল্য ১৫০ টাকা। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ৫০ টাকা।
টিকিট কেটে প্রধান ফটকের দিকে এগোলেই হাতের দুপাশে দুটি মিনি পুকুর চোখে পড়বে, যাতে ভাসছে দেশি কচুরিপানা। টিকিট চেকারের হাতে টিকিট দিয়ে প্রবেশ করতেই সামনে সবুজ খেলার মাঠ ধরা দেবে। মাঠের ওপরের প্রান্তে দৃষ্টিনন্দন স্কুল ভবন। এখানকার সব ভবন গড়া ছাই রঙের সিমেন্টের ব্লকে। ব্লকের ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো-বাতাস ঘরে ঢোকে। সিমেন্টের ব্লক, কাচঘেরা দেওয়াল আর কাঠ-বাঁশের সমন্বয়ে তৈরি প্রতিটি স্থাপনা। পাশাপাশি দুটি স্কুল ভবনের একটিতে শিশু শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি, অন্যটিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পড়ে। যদিও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির কলেজ শাখা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। পাশেই নির্মাণाधীন বিশাল অডিটোরিয়াম, যা হবে সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র।
সবুজের টানে মেঠো পথ ধরে হাঁটতে গেলে ঘন সবুজ অরণ্য চোখে পড়বে। ঝিঁঠি পোকার ডাক আর পাখির কলরব নীরবতা ভাঙে। নাম না জানা অনেক গাছ, কোনোটায় ফুল ফুটে। ছোট-বড় ঝোপালো গাছের সঙ্গে বড় কাষ্ঠলগাছ, লতানো কাষ্ঠলও। এমন মোটা লতা যে দুহাতে মুঠোয় নেওয়া যায় না। কোথাও ঝাউগাছের সারি, কোথাও ছাঁটাই করা দেবদারু ছাতার মতো দেখায়। নিচে ঝোপালো রঙ্গনের সারি, থোকা রঙিন ফুল উঁকিঝুঁকি দেয়। কোথাও ট্রি-হাউস, গাছের ওপর বসার ব্যবস্থা। তবে বৃষ্টির দিন গাছে ওঠা উচিত নয়, পিছলানোর আশঙ্কা আছে।
পুরো পার্ক ঘিরে রয়েছে পাঁচটি লেক। লেকের পাড়ে নারকেলগাছের সারি। কোনো লেকে শাপলা-পদ্মপাতা, ফুলের মৌসুমে ফুলও দেখা যাবে। পানির নিচে মাছ না দেখলেও ওপরে শত শত হাঁস ভাসে। হাঁসের সঙ্গে নৌকায় ঘোরার সুযোগ আছে, প্রতি আধা ঘণ্টায় ২০০ টাকা। লেকের মাঝে কৃত্রিম দ্বীপ, নারকেল-দেবদারুতে ঘেরা। দ্বীপে হিমেল বাতাসে বসার ব্যবস্থা। যাওয়ার মাধ্যম বাঁশের সাঁকো ও ড্রামের ওপর ভাসমান কাঠের সেতু। অভিজ্ঞতা না থাকলে সাবধানে চড়তে হবে, সেতু দোলে।
পার্কের শেষে গোল চাকতির মতো 'অন্বেষা—পথ ও পাতেয়' লাইব্রেরি। মাঝখান ফাঁকা, চারপাশ সিমেন্ট ব্লকের গোল দেওয়াল, চারতলা উঁচু। কাঠের পাটাতন-সিঁড়ি। জুতা খুলে প্রবেশ, ২০ টাকা টিকিট। ব্যাকপ্যাক রেখে নিরিবিলি দিন কাটানো যায়। উপরে উঠলে পুরো পার্ক দেখা যায়।
হাঁটতে হাঁটতে পার্কের একাংশে উঠান ঘিরে তিনটি মাটির ঘর চোখে পড়বে। স্টাফরা থাকেন এখানে। মাঝে ঘাসে ছাওয়া উঠান, ভেড়ার পাল ঘাস খায়। জলে হাঁস, স্থলে ভেড়া-গরু পালিত অ্যাগ্রো বিভাগে। গ্রামীণ আবহ উপহার দেয় জিন্দা পার্ক। বৃষ্টির ছন্দে টিনের ছাউনি-ঘেরা মাঠ, বটতলা, মাটির চুলা। ৩০০ জন হলে পিকনিকের ভাড়া নিয়ে করা যায়।
পান্থ নিবাস রেস্তোরাঁয় ক্লান্তি দূর করুন। দুপুরের খাবার জনপ্রতি ২৯০ থেকে ৮৮০ টাকা। সকালের নাশতা ১৩০ টাকা। বিকেলের নাশতায় চা, শিঙাড়া, সমুচা, পেয়াজু, পকোড়া, পুরি, জিলাপি, চিতই-ভাপা পিঠা। দলগত মিটিংয়ের আয়োজন আছে। টেবিলের মাঝে মটকা আকারের সিমেন্ট ডাস্টবিন। পুরো পার্কে ময়লা ফেলার সুযোগ নেই।
রেস্তোরাঁয় খাওয়া সেরে ডরমিটরিতে বিশ্রাম। ১২টি রুম, সারাদিনের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। রাতে থাকা যায় না। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা ভালো।
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে কুড়িল বিশ্বরোডে এসে বিআরটিসি বাসে ৪০ টাকা ভাড়ায় কাঞ্চন ব্রিজ। কাঁচপুর থেকে ২০ টাকায় ভুলতা গাউছিয়া, তারপর ৪০ টাকায় কাঞ্চন। অটোরিকশায় ৩০ টাকা। নিজের গাড়ি-মোটরসাইকেলে আসুন, পার্কিং গাড়ির জন্য ৫০, মোটরসাইকেল ৩০ টাকা। ঈদের দুই দিন বাদে বছরের প্রতিদিন খোলা, সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা সূর্য ডোবা পর্যন্ত।






