শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য রক্তে কয়েকটি খনিজের উপস্থিতি জরুরি। এসব খনিজকে ইলেকট্রোলাইট বলা হয়। এর মধ্যে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই ইলেকট্রোলাইটগুলো শরীরের পানি ও অ্যাসিড-ক্ষার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান নিশ্চিত করে, পেশির সংকোচন-প্রসারণে সাহায্য করে এবং হৃদয়কে সঠিক ছন্দে চালায়। কিন্তু কোনো কারণে এদের ভারসাম্য নষ্ট হলে শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী পরিণতি ঘটতেও পারে।
ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্সের কারণ নানা রকম। অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘক্ষণ কাজ বা ব্যায়াম করলে ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম বেরিয়ে যায়। ডায়রিয়া বা বমির ফলে দ্রুত পানি ও খনিজের ঘাটতি হয়।
এছাড়া কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা, কিছু ওষুধের ব্যবহার বা অপর্যাপ্ত পানি সেবনও এই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
সোডিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য ও স্নায়বিক কার্যক্রমের জন্য অত্যাবশ্যক। রক্তে এর মাত্রা কমে গেলে (হাইপোনাট্রেমিয়া) প্রথমে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব ও মাথাব্যথা হয়। পরে বিভ্রান্তি, আচরণগত পরিবর্তন, খিঁচুনি বা অচেতনতা পর্যন্ত ঘটতে পারে। অতিরিক্ত পানি পান করলেও সোডিয়ামের ঘনত্ব কমে যায়, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম পরিচিত কারণ।
পটাশিয়াম কোষের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট, যা পেশি ও হৃদয়ের কার্যক্রমে অপরিহার্য। এর ঘাটতি (হাইপোক্যালেমিয়া) হলে পেশিতে দুর্বলতা, ক্র্যাম্প, অবসাদ, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। গুরুতর অবস্থায় হার্টবিট অস্বাভাবিক হয়ে জীবনঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের অনেক এনজাইমের কাজে জড়িত এবং স্নায়ু-পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য জরুরি। এর অভাবে পেশিতে টান, খিঁচুনি, অস্থিরতা, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও হৃদয়ের ছন্দে অস্বাভাবিকতা হতে পারে। ম্যাগনেশিয়াম কমলে পটাশিয়ামের ঘাটতিও সহজে ঠিক হয় না, ফলে সমস্যা জটিল হয়।
ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে—
১. সুষম খাদ্য গ্রহণ: প্রতিদিনের খাবারে ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও গোটা শস্য রাখুন। কলা, ডাবের পানি ও কমলা পটাশিয়ামের ভালো উৎস। সবুজ শাকসবজি ও বাদামে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়।
২. পর্যাপ্ত পানি খান: অতিরিক্ত পানি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কম পানি খেলেও সমস্যা হয়। শরীরের চাহিদা মতো পানি পান করুন।
৩. ওআরএস বা ইলেকট্রোলাইট পানীয়: ডায়রিয়া বা বমির সময় শরীর দ্রুত পানি ও খনিজ হারায়। তখন ওআরএস বা ঘরে তৈরি লবণ-চিনি-পানির মিশ্রণ খুব কার্যকর।
৪. অতিরিক্ত ঘামে: খেলাধুলা বা গরমে কাজের সময় প্রচুর ঘাম হলে শুধু পানি নয়, প্রয়োজনে ইলেকট্রোলাইট-সমৃদ্ধ পানীয় নিন।
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ: উপসর্গ গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের কাছে যান। রক্ত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হবে।
ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্সে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা।






