বনানীতে ২৫ বছর ভাড়া বাসায় কাটানোর পর চার মাস আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে উঠে এসেছেন ফ্যাশন হাউস মানাস ও পপ–আপ রেস্তোরাঁ সঞ্চয়িতার স্বত্বাধিকারী শিল্পী ফায়জা আহমেদ। ছেলে সুনিয়েলের স্কুলের সুবিধার জন্যই বাড়ি বদল। সুনিয়েল ক্লাস ফোরে পড়ে। শহুরে বাসায় আলো-বাতাসের অভাব সত্ত্বেও এই বাসায় প্রচুর আলো-বাতাস এবং আনাচে-কানাচে পুরোনো দিনের স্মৃতি ও আভিজাত্য ছড়িয়ে আছে।
নতুন বাসায় উঠে সবকিছু নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন মনে করেন না ফায়জা। বাসা সাজানোর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বাজেট বা চলতি প্রচলন অনুসরণ করেন না তিনি। ‘আমি দেখি, আমার যা যা ভালো লাগে সেগুলো আছে কি না। আর সেই জিনিসগুলো কোথায় রাখলে আমার ভালো লাগবে।’
দরজার পাশের দেয়ালে লেখা ‘সুনিয়েল ও ফায়জার আনন্দ নিলয়ম’। বাসায় ঢুকলেই চোখে পড়ে বসার ঘরের সঙ্গে সংলগ্ন খাবার ঘর। দুই ঘরেই বড় বড় দুটি জানালা—বসার ঘরেরটি উত্তরমুখী এবং খাবার ঘরেরটি দক্ষিণমুখী। খালি জায়গা ফায়জার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, বাতাস চলাচল ও আলো প্রবেশের পথ থাকতেই হবে। ভারী পর্দা বা অপ্রয়োজনীয় আসবাব দিয়ে আলো-বাতাস আটকানো তাঁর পছন্দ নয়।
কাঠের টেবিল, শোকেস, সিন্দুক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোফা দিয়ে বসার ঘর সাজিয়েছেন ফায়জা আহমেদ। রান্নাঘরের সাধারণত আড়ালে থাকা জিনিস যেমন তামার পাতিল, ঝাঁঝরি—সেগুলো এখানে দৃশ্যমান স্থানে সাজানো। ‘যে জিনিস দিয়ে আমরা খাই, সেটাকে লুকিয়ে রাখার কোনো কারণ দেখি না।’
হাতে তৈরি জিনিস পছন্দ করেন ফায়জা। শান্তিনিকেতনের হাতে বোনা কাপড়ের পর্দা, মায়ের দেওয়া ছোটবেলার কাঁথা, মাটি ও কাঁসার পাত্র—এসব মিলিয়ে বসার ঘর হয়েছে স্মৃতির জীবন্ত শালা। অফিসের পুরোনো আলমারি নতুন করে রং করে নিয়েছেন। নতুন জিনিসের চেয়ে পুরোনো, ব্যবহৃত, গল্পভরা জিনিসই তাঁর প্রিয়। অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলেছেন।
ফায়জা বলেন, ‘মিনিমালিজমের ট্রেন্ডে গা ভাসাতে গিয়ে আমরা আর দেশি থাকতে পারছি না। আমার মনে হয় শুধু সাদা দেয়াল বা ইউরোপিয়ান ধাঁচের সাজ মিনিমালিজম নয়। বরং গ্রামবাংলার সহজ, কম জিনিস রাখার অভ্যাসই প্রকৃত মিনিমালিজম। গুগল কিংবা পিনটারেস্ট না দেখে আমার দেশের শিকড় কীভাবে সরল ছিল, সেটাকে অনুকরণ করতেই বেশি পছন্দ করি।’
শোবার ঘরে একটি খাট ও আলমারি। বাসাজুড়ে নানা চিত্রকর্ম—কিছু ফায়জার নিজের, কিছু ছেলের এবং কিছু সংগ্রহ করা। ডাইনিং টেবিলের দুপাশে দুটি বেঞ্চ, হেলান দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। টেবিলে যশোরের নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, কাঁসা-তামার পাত্র ও বৈজয়ন্তীর বীজ সাজানো।
খাবার ঘরের দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে বাগান দেখা যায়। বাগানের জন্যই এই বাসা নিয়েছেন ফায়জা। সকালে ঘুম ভাঙার পর বাগানে সময় কাটান। সাজানো বাগান পছন্দ নয় তাঁর, আগাছাও ফেলেন না। তুলসী, ধুন্দুল, কুমড়া, কলাগাছ, আকন্দ, বাসক, নিম, গাজর, কুমড়া, কাঁচা মরিচসহ নানা গাছ রয়েছে। সাদা, লাল ও গোলাপি জবা দিয়ে চুলের তেল বানান, আছে বাগানবিলাস ও ছেলের প্রিয় গোলাপ।
ফায়জা আহমেদের বাসায় কোনো টেলিভিশন নেই। আশির দশকের এক ফুটবল বিশ্বকাপে বাবা তাঁকে টিভি কিনে দিয়েছিলেন। এবার বিশ্বকাপে ছেলের আবদার মেটাতে নতুন টিভি কিনতে পারেন।
সিন্দুকে দুটি তালা লাগানো, পুরোনো দিনের টেলিফোনের মতো। পুরো বাসায় এটাই একমাত্র তালা। সিন্দুকে কিছু কাঁথা ও মায়ের দেওয়া অল্প গয়না। বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে বেশিরভাগ গয়না বিক্রি করেছেন। দেশের এক অ্যান্টিক শপ থেকে সিন্দুক কিনেছেন। ফায়জা বলেন, তাঁর বাসায় চোর এলে বিরক্ত হবে, নেবার মতো জিনিস বা ভাঙার মতো তালা পাবে না!






